Aajkaal: the leading bengali daily newspaper from Kolkata
কলকাতা ৬ বৈশাখ ১৪২১ রবিবার ২০ এপ্রিল ২০১৪
Aajkaal 33
 প্রথম পাতা   কলকাতা  বাংলা  ভারত  সম্পাদকীয়  উত্তর সম্পাদকীয়  নেপথ্য ভাষন  খেলা  রবিবাসর    পুরনো সংস্করন  বইঘর 
নেপথ্য ভাষন -অশোক দাশগুপ্ত--কাটাকুটির ‘কত’ কথা ।। সি বি আই নিয়ে আমাকে ভয় দেখাবেন না: মমতা--সুনীল চন্দ ও অভিজিৎ চৌধুরি ।। শ্রমিকরা বলবেন জঙ্গিপুর কার?--অরূপ বসু ।। মৌসমের পালে গনির হাওয়া--অমিতাভ সিরাজ, মালদা ।। সারদা, টেট কেলেঙ্কারি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বিঁধে গেলেন রাহুল --অভিজিৎ চৌধুরি, স্নেহাশিস সৈয়দ ।। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে লেনদেনের বিষয়ে সুদীপ্তকে জেরা করবে ই বি ।। ঘাম ঝরানো নেতার অম্তরেও পাগলু--অরুন্ধতী মুখার্জি ।। নিরপেক্ষভাবেই কাজ করতে হবে এস পি, ডি এম-দের নির্দেশ কমিশনের ।। আমেথিতে সোনিয়া: ইন্দিরার নীতি মেনেই রাহুলকে আপনাদের দিয়েছি ।। হুরিয়ত নেতা গিলানির কাছে মোদির দূত! অস্বীকার বি জে পি-র ।। মুখ্যমন্ত্রীর উস্কানিতেই বীরভূমে খুন: বিমান ।। কংগ্রেসের আসন বাড়ছে: অধীর
উত্তর সম্পাদকীয়

নিজেরে প্রকাশে আলো তাই তো সে আলো

নিজেরে প্রকাশে আলো তাই তো সে আলো

Google plus share Facebook share Twitter share LinkedIn share

বরুণ কর

৮ এপ্রিল, ২০১৪৷‌ না, সর্বাধিক প্রচারিত কোনও বাংলা দৈনিকে নয়, সাদামাঠা দুটি বাংলা সংবাদমাধ্যমে জানলাম কামদুনি প্রতিবাদী মঞ্চ শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণ করল দশ মাস আগে কামদুনিতে ঘটে যাওয়া এক নারকীয় ঘটনায় প্রাণ হারানো, স্বপ্ন শেষ হয়ে যাওয়া এক তরুণীকে৷‌ দাবি জানাল, দ্রুত বিচার ও অভিযুক্তদের শাস্তির৷‌ চোখের সামনে ভেসে উঠল আরও দুটি মুখ– মৌসুমি ও টুম্পা কয়ালের৷‌ ধারাবাহিক প্রচারের আলোয় থাকার অভ্যাস রপ্ত করতে বা সমাজের কেষ্টবিষ্টুদের সঙ্গে একই মঞ্চে আসীন হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া না করার তাড়নায় দিকভ্রাম্তির উদাহরণ আমাদের সমাজে অমিল নয় মোটেই৷‌ কিন্তু কী অসাধারণ স্হিতধী ও কৃতসঙ্কল্প দুটি মুখ৷‌ প্রচলিত সামাজিক মর্যাদার নিরিখে অতিসাধারণ গ্রাম্য দুই মহিলা৷‌ দুর্যোগের দশ মাস পরেও তবু স্হির লক্ষ্যে অবিচল, অনড়৷‌ তোমাদের সেলাম৷‌ ৭ এপ্রিল, ২০১৩৷‌ বারাসতের কীর্তিপুরের শিপ্রা ঘোষ বেপরোয়া নৃশংসতার শিকার হলেন৷‌ দুপুরবেলায় কলেজ থেকে ফেরার পথে বাস থেকে নামতেই উনিশ বছরের তরুণীকে তুলে নিয়ে গেছে, ধর্ষণ করে খুন করেছে দুষ্কৃতীরা৷‌ ঘটনার বীভৎসতায় স্তম্ভিত হয়ে গেছে গোটা রাজ্য৷‌ সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ঘটনার দু’দিন পর ‘ক্ষোভের আগুনে জ্বলতে থাকা বারাসতের কামদুনি জনপদ ঢুকতেই দিল না মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক ও নেতাদের৷‌’ দলমতের ঊধের্ব উঠে, কোনও রাজনীতির তোয়াক্কা না করে বাসিন্দারা সমস্বরে জানিয়ে দিলেন তাঁরা চান নিরাপত্তা ও দোষীদের শাস্তি৷‌ ঘটনার ৯ দিনের মাথায় কামদুনিতে পা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী৷‌ প্রতিশ্রুতি দিলেন, পনেরো দিনের মাথায় অভিযুক্তদের নামে চার্জশিট দেওয়া হবে এবং বিচার সম্পূর্ণ হবে এক মাসের মাথায়৷‌ এ কথাও জানানো হল– দোষীদের ফাঁসি চায় সরকার৷‌ মুখ্যমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে এলাকার বাসিন্দারা বিশেষত মহিলাদের কেউ কেউ সুবিচারের আশায় ছুটে গিয়েছিলেন তাঁর কাছে৷‌ একটাই দাবি তাঁদের– মহিলাদের নিরাপত্তা ও দোষীদের শাস্তি৷‌ নেতৃত্বে যে তিন মহিলার নাম সংবাদমাধ্যমে আমরা পেলাম তাঁরা হলেন মিতা, মৌসুমি ও টুম্পা কয়াল৷‌ ১৯ এপ্রিলের সংবাদপত্র পড়ে জানলাম ‘মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে সোমবার কামদুনিতে মহিলাদের বিক্ষোভের তদম্ত শুরু করেছে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা পুলিস৷‌’ শাসক দলের সর্বভারতীয় সম্পাদক জানালেন ওঁরা নাকি সি পি এমের সঙ্গে যুক্ত৷‌ মূল ঘটনা বা অপরাধ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা৷‌ মুখ্যমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে কামদুনির প্রতিবাদী গ্রামবাসীদের কপালে জুটল পুলিসের হয়রানি৷‌ হুমকি, ভয় দেখানো বাদ গেল না কিছুই৷‌ গড়ে উঠল প্রতিবাদী মঞ্চ৷‌ অন্যদিকে শাসক দলের প্রশ্রয়ে গড়া হল শাম্তিরক্ষা কমিটি৷‌ এলাকায় শুরু হল বিশেষ নজরদারির ব্যবস্হা, ফুটবল প্রতিযোগিতা, পিকনিক– কত কী! অল্প সময়ের মধ্যে খুন হওয়া কলেজ-পড়ুয়া তরুণীর পরিবারের সদস্যদের সরাসরি টাকা, চাকরির প্রলোভনে কিনে নেওয়ার চেষ্টা দেখা গেল৷‌ আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম যে যার কাজে৷‌ কিন্তু শত ব্যস্ততার মাঝেও টুম্পা, মৌসুমি এবং গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রদীপ মুখার্জি কিছুতেই ভুলতে পারলেন না কালো দিনটির কথা৷‌ প্রত্যেক মাসের ৭ তারিখ তাঁরা প্রতিবাদী মঞ্চে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন অকালে ঝরে যাওয়া ফুলটিকে, তাঁদের সঙ্গীকে৷‌

শুধুমাত্র কামদুনি তো নয়৷‌ শুরু তো সেই ২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পার্ক স্ট্রিটে এক মহিলাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা দিয়ে৷‌ ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই মুখ্যমন্ত্রী ‘সাজানো’ বলে দিলেন৷‌ তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান দময়ম্তী সেন ঘটনাটির সত্যতা জানালে তাঁকে বদলি করা হল উত্তরবঙ্গে৷‌ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত পুলিসের নাগালের বাইরে৷‌ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার মহিলা আজও বিচারের অপেক্ষায়৷‌ সমাজে স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে চলে নানারকম ঘটনা, তার প্রতিক্রিয়াও তাই ভিন্ন ভিন্ন৷‌ আমরা সাধারণ মানুষরা যদি বা একটু- আধটু মিছিল, প্রতিবাদ আন্দোলনে সামিল হয়ে নিজেদের সচেতনায় সন্তুষ্টি লাভ করি, শিল্পীমন কিন্তু অত সহজে তৃপ্ত হয় না৷‌ শিল্পী ডুব দেন ঘটনার গভীরে, নানা উপাদানের কার্যকারণ সম্পর্কের তত্ত্ব-তালাশে৷‌ পার্ক স্ট্রিটের ঘটনার আশ্রয়ে পরিচালক পার্থ মুখার্জি ‘পার্ক স্ট্রিট’ নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করলেন৷‌ কিন্তু জানা গেল, রাজ্য সরকারের নির্দেশে কলকাতা পুলিসের স্পেশাল ব্রাঞ্চের উদ্যোগে আপত্তি জানানো হয়েছে৷‌ ছবিটি আপাতত হিমঘরে৷‌ পার্ক স্ট্রিট থেকে শুরু করে কাটোয়া, বারাসত, গুড়াপ, বর্ধমান, আসানসোল, জলপাইগুড়ি, খরজুনা, সুটিয়া, গেদে, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়– নারী নিগ্রহের লম্বা ফিরিস্তি, যেন ফুরোবার নয়৷‌ ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪ কাগজের পাতায় ধর্ষণের পরে খুন হওয়া মায়ের পাশে সর্বস্ব হারানো শিশুসম্তানের ছবি কি পাঠকদের মনে পড়ে? কাটোয়ার সেই ধর্ষিত মহিলারও বরাতে জুটেছিল ‘মিথ্যাবাদী’ আখ্যা৷‌ মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘জেনে রাখুন কোনও ধর্ষণ হয়নি৷‌ ওঁর স্বামী সি পি এম করে৷‌ চক্রাম্ত করা হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে৷‌’ অথচ ধর্ষিতার স্বামী মারা যান এগারো বছর আগে৷‌ এত বড় মিথ্যাচার! আর সেই মিথ্যাচারের এক সাক্ষী আজ রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের শীর্ষপদে আসীন৷‌ ৩০ জানুয়ারি ব্রিগেডের সভায় মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যবাসীকে জানালেন, রাজ্যে ‘নারীরা নিরাপদ, দু-একটা ছোটখাটো ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি হচ্ছে৷‌ কেউ কেউ একটা-দুটো ঘটনা নিয়ে বাংলার বদনাম করছে৷‌ দামাল ছেলেরা কখনও কখনও একটু দুষ্টুমি করে৷‌’ প্রকৃত সত্য এটাই৷‌ নতুন সরকারের রাজত্বকালে ইতিমধ্যেই ঘটে যাওয়া প্রায় আড়াইশোর মতো ঘটনার প্রত্যেকটিতে দেখা গেছে ঘটনাকে লঘু করে অভিযুক্তদের আড়াল করার চেষ্টা৷‌ তদম্তের জরুরি পদক্ষেপগুলিকে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট ও লোপাটের৷‌ এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে বাড়তি বালাই প্রশাসনের দুর্ব্যবহার ও অসহযোগিতা৷‌ মুখ্যমন্ত্রী ফেসবুক পছন্দ করেন৷‌ দুর্গাপুজো থেকে ছটপুজো কোনও কিছুই বাদ যায় না ফেসবুকে৷‌ কিন্তু নারী নিগ্রহ নিয়ে প্রশাসনিক প্রধানের কোনও মম্তব্য আমাদের নজরে পড়েনি৷‌ জাতীয় মহিলা কমিশন থেকে শুরু করে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য কোনও কিছুতেই আমল দিতে চাইছে না পরিবর্তনের সরকার৷‌ এতটাই বেপরোয়া! এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেও প্রশাসন চার্জশিট দিতে পারছে না, বিচার তো দূরস্হান৷‌ সরকারি ছাড়পত্র পেয়ে দুষ্কৃতীদের উল্লম্ফন ক্রমবর্ধমান৷‌ কিন্তু একসময় রাজপথে আলোড়ন তোলা বুদ্ধিজীবীরা আজ গেলেন কোথায়?

এই প্রেক্ষিতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলির সঙ্গে এ রাজ্যে নারী নিগ্রহের বিষয়টি নিশ্চয়ই বিশেষ মাত্রা পেয়ে যায়৷‌ কিন্তু সংবাদমাধ্যমেই জানা যাচ্ছে নির্বাচনী প্রচারে দেওয়াল লিখনে নাকি নারী নিগ্রহ ও সারদা কেলেঙ্কারির উল্লেখ বরদাস্ত করা হবে না৷‌ সারা রাজ্যে নৈরাজ্যের বাতাবরণে অত্যম্ত সুকৌশলে হিসেব করে কালিমালিপ্ত করা হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতাকে৷‌ এ ক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগ প্রশংসনীয়৷‌ অতিসম্প্রতি এক অধ্যাপক ঢাকঢোল পিটিয়ে শাসক দলের মদতপুষ্ট সংগঠন ‘কুপা’-তে যোগ দেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে যোগদান বিষয়ে জানিয়েছেন ‘বেশ করেছি৷‌ এটা আমার সংবিধানিক অধিকার৷‌’ কথাটা মুখে মানিয়েছে বেশ৷‌ তিনি কবিও৷‌ আনুগত্য বদলের দিনে তাঁর ঐতিহাসিক (ক্ক) ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাসের কথা মনে এসেছিল৷‌ কমিউনিস্ট পার্টি ভাঙা, ইউনিয়ন ভাঙার মতো বিষয়গুলি তাঁকে যথেষ্ট মনোকষ্ট দিয়েছিল৷‌ তিনি পার্টিবিমুখ হয়ে উঠেছিলেন৷‌ কিন্তু গণবিমুখ হননি কখনও৷‌ রসিকতা করে বলতেন ‘বাঁয়ে হাইলছিলাম (হেলে ছিলাম), অভ্যাস অইয়া গেছে, ডাইনে আর হাইলতে পারলাম না৷‌ (সূত্র: উজান গাঙ বাইয়া৷‌হেমাঙ্গ বিশ্বাস)৷‌ অভ্যাসবশত হেলার চাইতে সুযোগ বুঝে হেলাতেই যেহেতু আখেরে লাভ বেশি, তাতে অনেকেই আমরা দিশেহারা৷‌ এ তো গেল গড়পড়তার কথা৷‌ পরিবর্তন-পরবর্তী জমানায় পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে ‘ভাঙা কুটীরের সারি’ একটু খোঁজ করলেই পাওয়া যাবে৷‌ পাওয়া যাবে গ্রাম্য কিশোরীর ‘আশা-স্বপনের সমাধি’ হওয়ার মতো ঘটনাও৷‌ তবে আশার কথা একটাই– আলোকবর্তিকার মতো সে গাঁয়ে এখনও জেগে থাকে টুম্পা, মৌসুমিরা৷‌ এটা ব্যতিক্রম৷‌ তাই ওঁদের আবারও সেলাম৷‌ রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, ‘নিজেরে প্রকাশে আলো তাই তো সে আলো’৷‌






kolkata || bangla || bharat || editorial || post editorial || nepathya bhasan || khela ||
sunday || Error Report || archive || first page

B P-7, Sector-5, Bidhannagar, Kolkata - 700091, Phone: 30110800, Fax: 23675502/5503
Copyright © Aajkaal Publishers Limited

Designed, developed & maintained by   Remote Programmer Private Limited