Aajkaal: the leading bengali daily newspaper from Kolkata
কলকাতা ৬ কার্তিক ১৪২১ শুক্রবার ২৪ অক্টোবার ২০১৪
 প্রথম পাতা   কলকাতা  বাংলা  ভারত  বিদেশ  সম্পাদকীয়  উত্তর সম্পাদকীয়  খেলা   পুরনো সংস্করন  বইঘর 
মোম, আতশের আলোয় মাতোয়ারা রাজ্যে থিমও এবার নায়ক--কাকলি মুখোপাধ্যায় ।। আজ খাগড়াগড়ের ঘটনাস্হলে যাবেন এন আই এ-র ডি জি--চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ।। পুলিস হাসপাতালের সামনেই দেদার ‘ক্যাডবেরি’!--সোমনাথ মণ্ডল ।। টাকার উৎস খুঁজতে জেলা পুলিসেরই সাহায্য নিচ্ছে এন আই এ, ই ডি ।। কলকাতার কাউন্সিলরদের নিয়ে বৈঠক ডাকলেন মমতা--দীপঙ্কর নন্দী ।। তৃণমূল কাউন্সিলরের নেতৃত্বে তথ্যপ্রযুক্তি কর্তাকে মারধর, অফিস ভাঙচুর দুর্গাপুরে ।। শিবসেনা: ১৯৯৫-এর সূত্র বি জে পি: কী করে হবে? ।। শরিফকে গদিচ্যুত করতে জনমত গড়বেন বিলাওল ।। কেশপুরে তৃণমূল নেত্রী খুনে সন্দেহের তীর স্বামীর দিকে ।। জনসংযোগ বাড়াতে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন এবার ফেসবুকে ।। সিয়াচেনের হিম-কঠোর উচ্চতায় মোদির দেওয়ালি ।। খুলেও খুলল না জেসপ, হতাশায় ৬৫০ শ্রমিক!
উত্তর সম্পাদকীয়

হৃদয়ে লেখা যে নাম

হৃদয়ে লেখা যে নাম

Google plus share Facebook share Twitter share LinkedIn share

বরুণ কর

‘কাকা কখনও চাননি সঙ্গীতের নির্দিষ্ট কোনও এক ধারার মধ্যে বা কোনও এক গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে৷‌ সবসময় চাইতেন সবরকম গান গাইতে৷‌’ আর ‘...গান শুধু গাইলেই চলবে না, তা গাইতে হবে সবচেয়ে ভালভাবে এবং নিখুঁতভাবে৷‌ কাকার সঙ্গীত সম্বন্ধে চিম্তাভাবনার এই দিকটা আমি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছি সারা জীবন ধরে৷‌’ প্রথম এবং প্রকৃত শিক্ষাগুরুর বিনম্র স্মৃতিচারণে গুরুর উজ্জ্বল যে দিকটা শিষ্য পাঠক সাধারণের কাছে তুলে ধরেন তাতে পাঠক হিসেবে একই সঙ্গে গুরু ও শিষ্যকে আমরা আমাদের উপলব্ধিতে ধরে ফেলার সুযোগ পেয়ে যাই৷‌ বুঝতে অসুবিধা হয় না শিষ্যের মন-মুকুরে গুরুর ছায়াটি সশ্রদ্ধ প্রশ্রয়ে যে শুধু প্রলম্বিত হয়েছে তাই নয়, একই সঙ্গে তা রসসিক্ত করেছে, সঞ্জীবিত করেছে, উজ্জীবিত করেছে উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় আর এক সঙ্গীত-প্রতিভাকে৷‌ অনন্যসাধারণ এই দুই কিংবদম্তির একজন কৃষ্ণচন্দ্র দে, অন্যজন তাঁরই ভ্রাতুষ্পুত্র ও সুযোগ্য শিষ্য মান্না দে, পোশাকি নাম প্রবোধচন্দ্র দে৷‌

কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গীতশিক্ষা পর্বটি বেশ নাটকীয়৷‌ আর-পাঁচজন কিশোরের মতো কৃষ্ণচন্দ্রও মগ্ন থাকতেন লেখাপড়া, খেলাধুলো, ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে৷‌ ওঁর যখন তেরো বছর বয়স, বিকেলবেলায় ছাদ থেকে ঘুড়ি উড়িয়ে নিচে নেমে মাকে বলে চোখে প্রায় অন্ধকার দেখার কথা৷‌ ডাক্তার দেখানো হল কিন্তু লাভ হল না তেমন৷‌ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেল কৃষ্ণচন্দ্রের৷‌ কিন্তু ‘ওঁর কাছে অন্ধত্বটা মনে হয় অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ’ হয়েই এল– এ অনুভব মান্না দে-র৷‌ কৃষ্ণচন্দ্রের মা, মান্না দে-র ঠাকুমা রত্নমালা চিম্তা করতে লাগলেন, ‘কীভাবে কারও দয়া বা অনুগ্রহ ছাড়াই জীবনে প্রতিষ্ঠা এনে দেওয়া যায়’ কৃষ্ণচন্দ্রকে৷‌ ঠাকুমা লক্ষ্য করলেন ‘বাড়িতে ভিক্ষে করতে আসা লোকজন যারা গান গেয়ে ভিক্ষে করতে আসে, ...তাঁরা চলে যাওয়ার পরেই’ কৃষ্ণচন্দ্র একবার শোনা গানগুলো হুবহু গেয়ে দেয়৷‌ ঠাকুমা আর দেরি করেননি৷‌ তখনকার দিনে বিত্তশালী অথচ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতচর্চা ও প্রসারে আগ্রহী হরেন্দ্রনাথ শীলের কাছে কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ে গেলেন৷‌ এইভাবেই শুরু কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গীতশিক্ষার প্রাথমিক পর্ব৷‌ হরেন্দ্রনাথ শীলের তত্ত্বাবধানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম পেলেন ওস্তাদ বাদল খাঁ সাহেবের কাছে৷‌ নতুন কিছু শেখার ব্যাপারে ‘অদ্ভুত ক্ষমতা এবং উৎসাহ’ ছিল কৃষ্ণচন্দ্রের৷‌ সারা ভারতে একজন প্রথম সারির শিল্পী হিসেবে নাম করার পর মান্না দে-র অনুজ প্রভাস দে-র সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়ে শুনতে পেলেন অপূর্ব এক কীর্তন৷‌ সঙ্গে সঙ্গে খোঁজ শুরু৷‌ গায়ক বংশীধারী চট্টোপাধ্যায়ের কাছে সরাসরি আবেদন ‘আমি আপনার কাছে কীর্তন শিখতে চাই৷‌’ শিখলেনও৷‌ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি তখন মূলত খেয়াল পরিবেশন করেন, কোনও একজন ধ্রুপদ শিল্পী মম্তব্য করলেন ‘আসল শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তো ধ্রুপদ আর ধামার৷‌ সেটা কি আর কেষ্টবাবু সেভাবে গাইতে পারেন?’ কৃষ্ণচন্দ্রের মনে ধরল কথাটা৷‌ দেরি না করে শুরু করে দিলেন ধ্রুপদের পাঠ নেওয়া বিখ্যাত ধ্রুপদিয়া ওস্তাদ দবীর খাঁ সাহেবের কাছে৷‌ খেয়াল, ধ্রপদ, ধামার, কীর্তন এমনকি অনেক ধরনের আধুনিক গান গাওয়ার পর কৃষ্ণচন্দ্রের ইচ্ছা হল নাৎ শিখবেন৷‌ উর্দু ভাষায় লেখা পীরপয়গম্বরদের স্তুতিমূলক এই নাৎ গানে উচ্চারণের সামান্য ত্রুটিও অমার্জনীয় অপরাধ৷‌ ভাষা শিক্ষার গুরু হিসেবে ‘সৈয়দ সাহাব’-কে খুঁজে বের করলেন৷‌ উর্দু শিখতে আরম্ভ করলেন ‘নিখুঁত উচ্চারণ ও নিখুঁত খাসিয়ৎ’সহ৷‌

নতুন কিছু শেখার প্রতি অদম্য আগ্রহ এবং সবকিছু নিখুঁত করে তোলার এই প্রয়াস তো আমরা মান্না দে-র মধ্যেও পাই৷‌ সার্থক উত্তরাধিকার তো একেই বলে! অথচ ছটফটে, ডাকাবুকো প্রকৃতির মান্না দে-র মনের গভীরে সঙ্গীতশিল্পী হয়ে ওঠার ক্ষীণতম ইচ্ছেও ছিল না একসময়৷‌ কিন্তু যে বাড়িতে কৃষ্ণচন্দ্রের মতো শিল্পীর বসবাস, দিনরাত ভারতবর্ষের খ্যাতনামা সব শিল্পীর আনাগোনা, সেখানে ‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়’-এর মতোই মান্না দেও একসময় উপলব্ধি করলেন যে ‘সঙ্গীতকে সেইভাবে ভালবেসে ফেলার আগে সঙ্গীতই’ তাঁকে আপন করে নিয়েছে৷‌ আসলে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি তো একটা চলছিলই৷‌ গানের ঘরে হয়ত আব্দুল করিম খাঁ সাহেব বা ফৈয়াজ খাঁ সাহেব গান করছেন৷‌ বাইরে থেকে শুনে মান্না দে একটা বড় তান করে চমকে দিচ্ছেন ওস্তাদদের৷‌ কিংবা কখনও ওস্তাদ ফিদা হোসেন খাঁ তবলা বাজনা শেষ করে ঘর ছাড়তেই ওস্তাদজির বাজানো বোল বাজিয়ে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন ওস্তাদজিকে৷‌ এ ছাড়া, কাকা হয়ত ওস্তাদদের কাছে গানের তালিম নিচ্ছেন, তো সেই গানের কথা বা বন্দিশ লিখে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করা, কখনও বা কাকার হুকুমে তানপুরা ছাড়া বা হারমোনিয়ামে ফলো করা এসব চলছিল৷‌ শিক্ষানবিশির এমন সুযোগই বা কজনের ভাগ্যে জোটে! দেবকী বসুর ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার কাজে কাকা দু’মাসের জন্য মুম্বই যাবেন৷‌ যাওয়ার আগের দিন ওস্তাদ দবীর খাঁ হাজির কাকাকে তালিম দিতে৷‌ কাকা থাকবেন না উনি জানতেন না৷‌ উনিও এসেছেন দু’মাসের জন্য৷‌ কাকা থাকবেন না তো কী হয়েছে? উনি নিজেই উৎসাহী হলেন এই দু’মাস মান্না দে-কে তালিম দেওয়ার জন্য৷‌

মান্না দে জানাচ্ছেন ‘আমাদের বাড়িতে সেই সময়কার প্রায় সমস্ত গুণীজন গাইয়ে বাজিয়েদের আগমন ঘটলেও বা গান বাজনার নিরম্তর একটা চর্চা হলেও....৷‌ বাড়ির সবাই চাইতেন– ছেলেরা একটু আধটু গান জানে, এই যথেষ্ট৷‌ এটাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই৷‌’ দাদু শিবচন্দ্র ছিলেন ব্যবসায়ী মানুষ, নানা রকমের ব্যবসা ছিল তাঁর৷‌ দাদুর তিন ছেলে– পূর্ণচন্দ্র, হেমচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্র৷‌ বড় ছেলে পূর্ণচন্দ্র (বাবা) গ্র্যাজুয়েট হয়ে চার্টার্ড ব্যাঙ্কে চাকরি শুরু করলেন৷‌ মেধাবী এবং নিয়মনিষ্ঠ হেমচন্দ্র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে চাকরি করতেন৷‌ আর কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গীতচর্চা তো একরকম যাকে বলে অনন্যোপায় হয়ে৷‌ সেইসময় সঙ্গীতশিল্পীদের প্রচুর সম্মান থাকলেও উপায় অর্জন সেরকম কিছু ছিল না৷‌ বেশিরভাগ শিল্পীই আর্থিক অসচ্ছলতায় কষ্ট পেতেন৷‌ তাই মেজকাকার ফরমান ছিল ওকালতি পড়তে হবে৷‌ কিন্তু ততদিনে মান্না দে সিদ্ধাম্ত নিয়ে ফেলেছেন, ‘গান ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না, আমি গানই শুধু গাইব৷‌’ বলেও ফেললেন কথাটা মেজকাকাকে৷‌ কিন্তু মেজকাকার সিদ্ধাম্তে নড়চড় হওয়ার সম্ভাবনা না দেখে শরণাপন্ন হলেন তাঁর প্রিয় বাবুকাকা, কৃষ্ণচন্দ্রের৷‌ কৃষ্ণচন্দ্র শিষ্যকে বাজিয়ে দেখতে চেয়ে বললেন, ‘গান শিখতে শুরু করা খুবই সোজা৷‌...৷‌ কিন্তু গানের সাধনায়, সারা জীবন উৎসর্গ করা৷‌...৷‌ ভীষণ শক্ত কাজ৷‌ তুই কি পারবি?’ দৃঢ়তায় ভরপুর মান্না দে-র উত্তর ছিল ‘তুমি শেখালে আমি নিশ্চয়ই তা পারব, পারতে আমাকে হবেই৷‌’

শুরু হল স্টুডিও পাড়ায় আনাগোনা৷‌ পাকাপাকিভাবে কাকার সেকেন্ড অ্যাসিস্ট্যান্টও হয়ে গেলেন৷‌ প্রথম সহকারী ছিলেন বিষ্ণু মিত্র, বংশীবাদক৷‌ কাকা ছিলেন নিউ থিয়েটার্সের সঙ্গীত পরিচালক৷‌ নিউ থিয়েটার্সে তখন চাঁদের হাট৷‌ বিভিন্ন বিভাগের গুণী মানুষজনের সমাবেশ সেখানে৷‌ বিখ্যাত গীতিকার শৈলেন রায় কাকার কাছে গান শেখেন, শখের সাহিত্যচর্চার ফাঁকে গানও লিখতেন৷‌ ওঁর লেখা দুটো কবিতা ‘বালুকা বেলায় অলস খেলায় যায় বেলা’ এবং ‘ওগো সারাটি যামিনী জাগি’ সুর করে ফেললেন মান্না দে৷‌ স্বনামধন্য গায়িকা সুপ্রীতি ঘোষ (মহালয়ার ‘বাজল তোমার আলোর বেণু’ খ্যাত) ১৯৪০ সালে প্রথম গানটি রেকর্ড করেন৷‌ মান্না দে-র বয়স তখন একুশ৷‌ ১৯৪২ সাল– মুম্বইয়ের সিরকো প্রোডাকশনের ব্যানারে শুরু হবে ‘তামান্না’ ছবির কাজ৷‌ বিখ্যাত চিত্র-পরিচালক ফণী মজুমদার ছবিটি পরিচালনা করবেন৷‌ সঙ্গীত-পরিচালকের ভূমিকায় কৃষ্ণচন্দ্র৷‌ মান্না দে কাকার সহকারী হয়ে পাড়ি দিলেন মুম্বই৷‌ ছবিতে একটা ডুয়েট গান ছিল (জাগো আঈ ঊষা)৷‌ মান্না দে সুযোগ পেলেন ছেলের গলায় গানটি গাইবার৷‌ আর মেয়ের গলায় কন্ঠ দিলেন সুরাইয়া৷‌ মান্না দে-র গাওয়া সেই প্রথম প্লে ব্যাক৷‌ সহকারী হিসেবে কাজের পাশাপাশি সঙ্গীতশিক্ষাও চলতে লাগল একই তালে৷‌ মান্না দে মনোনিবেশ করলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সাধনায়৷‌ বাদল খাঁ সাহেবের কাছে তালিম আগেই পেয়েছেন৷‌ তিনি উপলব্ধি করলেন এটাই হবে তাঁর ‘তুরুপের তাস’ যা দিয়ে তিনি তাঁর সমসাময়িক শিল্পীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন, করে নিতে পারেন নিজের স্বতন্ত্র জায়গা৷‌ আমন আলি খাঁ সাহেবের কাছে শুরু হল তালিম৷‌ ওস্তাদজি শেখালেন সঙ্গীত শুধু ‘সুর নয়– সুর ও ভাষার একটা সঠিক সংমিশ্রণ৷‌’ শিখলেন কী করে ‘ই’ ও ‘ঈ’, ‘উ’ ও ‘ঊ’-এর তফাত করতে হয়৷‌ শব্দের ডিস্ট্রিবিউশন শিখলেন যাতে শব্দের উচ্চারণ সঠিক হয় ও অম্তর্নিহিত ভাবটি যথার্থভাবে প্রকাশ পায়৷‌ খাঁ সাহেবের মৃত্যুর পর মান্না দে পড়লেন চিম্তায়– কার কাছে আবার শুরু করা যায়! মুম্বই রেডিও থেকে গান গেয়ে ফিরছেন৷‌ হঠাৎ একজন বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন– মান্না দে কোথায় যাচ্ছেন, বাড়ি কোথায় জাতীয় প্রশ্ন৷‌ তারপর ওঁর সম্মতিতে গাড়িতে উঠে পড়ে বললেন তিনি মান্না দে-র গান শুনেছেন, প্রশংসাও করলেন গানের৷‌ তারপরই মান্না দে-কে চমকে দিয়ে প্রস্তাব ‘আমি তোমায় গান শেখাব৷‌’ মান্না দে ওঁর পরিচয় জানতে চাইলেন৷‌ উনি যে পরিচয় জানালেন তাতে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই৷‌ উনি আর কেউ নন, পাতিয়ালা ঘরানার বিখ্যাত ওস্তাদ আবদুল রহমান খাঁ সাহেব৷‌ মান্না দে সবিনয়ে জানালেন গুরুজির উপযুক্ত সম্মানদক্ষিণা তিনি দিতে পারবেন না৷‌ আবারও অবাক করা উত্তর গুরুজির ‘আমি তো শুধু তোমাকে গান শেখাতে চেয়েছি৷‌ টাকা পয়সার কথা তো কিছু বলিনি৷‌’ তারপর থেকে রোজ সকালে খাঁ সাহেব চলে আসতেন গান শেখাতে৷‌ এরপর ওঁর কাছেই শুরু হল একটু অন্য ধরনের গান শেখা, যাকে লাইট ক্লাসিক্যাল বলে আর কি৷‌ খাঁ সাহেব মুম্বই রেডিওতে লাইট ক্লাসিক্যাল গাইতেন সুরেশ কুমার নামে৷‌ মান্না দে-র অকপট স্বীকারোক্তি ‘উৎসাহী শ্রোতা বা উৎসুক সাংবাদিকেরা যখন বারবার জানতে চেয়েছেন যে, আমি কী করে আমার গলায় গানের ভিসুয়ালাইজেশনটা তুলে ধরি....৷‌ আমি বারবার ওস্তাদজির কথা স্মরণ করেছি৷‌’ ওস্তাদ গুলাম মোস্তাফা খাঁ সাহেবের কাছেও দীর্ঘদিন তালিম নিয়েছেন তিনি৷‌ শুধু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতই নয়, বিদেশি সুরও তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল৷‌ আকৃষ্ট হয়েছেন বিং ক্রসবি, পেরি কমু, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, জিম রিভস-এর গানে৷‌ কাকার সহকারী তো ছিলেনই৷‌ এ ছাড়া কাজ করেছেন অনিল বিশ্বাস, ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ, শচীন দেববর্মণদের সঙ্গে৷‌ ‘চেষ্টা করতাম– যার যেটুকু ভাল, তা গ্রহণ করে নিজের সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করতে৷‌’ প্রবাদপ্রতিম সুরকার জুটি শঙ্কর-জয়কিষাণের শঙ্করজি মান্না দে-কে চিনতে ভুল করেননি৷‌ মান্না দে-র শিল্পীসত্তাকে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত করে তুলতে বৈচিত্র্যে ভরা একের পর এক সুর করেছেন এবং তা গাইয়েছেন মান্না দে-কে দিয়ে৷‌ মান্না দেও তাঁর সমস্ত দক্ষতা দিয়ে, সযত্নে গেয়েছেন মনোমুগ্ধকর সেই সব গান৷‌ সলিল চৌধুরি, অনিল বিশ্বাস, নৌশাদ, বসম্ত দেশাই, রোশন, মদনমোহন, কল্যাণজি আনন্দজি, রবি, সি রামচন্দ্র, লক্ষ্মীকাম্ত-প্যারেলাল, জয়দেব, এস এন ত্রিপাঠী, রবীন্দ্র জৈন, রাহুল দেববর্মন– এঁরাও মান্না দে-কে দিয়ে গাইয়েছেন অপূর্ব সব গান (পরিসরের সীমাবদ্ধতায় বাংলা গানের প্রসঙ্গ বাদ রইল)৷‌ জনপ্রিয় নায়ক অমিতাভ বচ্চনের বাবা হরবনস রাই বচ্চনের লেখা ‘মধুশালা’ মান্না দে গেয়েছিলেন জয়দেবের সুরে৷‌ এককথায়, সব সময় তিনি চেয়েছেন, তাঁর সঙ্গীতজীবন হোক রঙিন, ঝলমলে, বৈচিত্র্যপূর্ণ৷‌ মেহনতও করেছেন তার জন্য৷‌ ‘আপস’ শব্দটি ওঁর অভিধানে ছিল না৷‌ মালয়ালাম ছবি ‘চেম্মিন’-এর জন্য সলিল চৌধুরি তৈরি করলেন ‘মানস মইনে বরু’ গানটি৷‌ গাইতে হবে মান্না দে-কে৷‌ উচ্চারণ যাতে ত্রুটিমুক্ত হয় তার জন্য শরণাপন্ন হলেন স্ত্রী সুলোচনার৷‌ তিনি কেরলের মেয়ে শুধু নন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন একসময়৷‌ গানটির জনপ্রিয়তা মান্না দে-কে এনে দিল জাতীয় পুরস্কার৷‌

এইভাবে শুধু হিন্দি বা বাংলা নয়, ভারতবর্ষের প্রায় সবকটি প্রধান ভাষায় অজস্র গান গেয়েছেন মান্না দে এবং সেই গীতসম্ভার স্বাদে, স্বাতন্ত্র্যে ও বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে৷‌ মারাঠি গানে মান্না দে-র উচ্চারণ একজন সদাচারী ব্রাহ্মণের চেয়েও ভাল– এ প্রশস্তি স্বয়ং লতা মঙ্গেশকরের৷‌ গুজরাটের প্রত্যম্ত অঞ্চলে কোনও কোনও বিশেষ সময়ে যে ‘হেলো’ গান গাওয়া হয়, তার অধিকাংশই মান্না দে-র গাওয়া৷‌ এ সবই সম্ভব হয়েছে শিক্ষার্থী মান্না দে-র নিষ্ঠা ও একাগ্রতায়৷‌ সঙ্গীতজীবনে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও শিক্ষাগ্রহণে কখনওই অনীহা প্রকাশ করেননি৷‌ সুদীর্ঘ কর্মজীবনে গুণীজনের সান্নিধ্যে নিজেকে শুধুই সমৃদ্ধতর করেছেন৷‌ সমসাময়িক শিল্পীবন্ধুদের প্রতি তাঁর মুগ্ধতা ও শ্রদ্ধাবোধ তাঁকে দিয়েছে এক অন্য উচ্চতা৷‌ অভিভাবকসুলভ সহৃদয়তায় আপন করে নিয়েছেন সবাইকে৷‌

২৪ অক্টোবর, ২০১৩ আজীবন শিক্ষার্থী মান্না দে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন৷‌ শেষ দিন পর্যম্ত গান গাইবার ইচ্ছাকে কমে যেতে দেননি এতটুকু৷‌ সুর, তাল, ছন্দের জাদুতে নিজে ভেসে আমাদের ভাসিয়েও তাঁর মনে হয়েছে আরও কত বাকি রয়ে গেল! আমাদের প্রাপ্তির পেয়ালা তিনি ভরে দিয়েছেন কানায় কানায়৷‌ তাঁর গান থেমে গেছে, কিন্তু মনের ঘরটা জুড়ে রয়ে গেছে তাঁর গানের মিষ্টি গন্ধ, তা রয়ে যাবে৷‌ আর হৃদয়ের গভীরে সোনার আখরে লেখা তাঁর যে নাম– সে নামও রয়ে যাবে চিরভাস্বর হয়ে৷‌

(তথ্যসূত্র: জীবনের জলসাঘরে– মান্না দে)





kolkata || bangla || bharat || bidesh || editorial || post editorial || khela ||
Error Report || archive || first page

B P-7, Sector-5, Bidhannagar, Kolkata - 700091, Phone: 30110800, Fax: 23675502/5503
Copyright © Aajkaal Publishers Limited

Designed, developed & maintained by   Remote Programmer Private Limited