Aajkaal: the leading bengali daily newspaper from Kolkata
কলকাতা ৩ ভাদ্র ১৪২১ বুধবার ২০ আগস্ট ২০১৪
 প্রথম পাতা   কলকাতা  বাংলা  ভারত  বিদেশ  সম্পাদকীয়  উত্তর সম্পাদকীয়  খেলা   পুরনো সংস্করন  বইঘর 
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সফল বৈঠক ।। শুনিয়া-কাণ্ডে গ্রেপ্তার ৩ তৃণমূলি--ধর্ষণ, খুনের অভিযোগ ওড়াল পুলিস ।। সারদার সমস্ত সম্পত্তি লুটপাট হচ্ছে: সুদীপ্ত ।। না জানিয়ে পান্ধই-চার্জশিট! ক্ষুব্ধ কোর্টের তলব ডি জি-কে ।। দিল্লি কঠোর, তাও পাক দূতের কাছে গিলানি, বাইরে বিক্ষোভ ।। কাল উপনির্বাচন, সমীক্ষা বলছে বিহারে সমানে সমানে দুই শিবির ।। যোজনা কমিশনের বিকল্প নিয়ে জনমত চাইছেন মোদি ।। বিরোধী নেতার পদ: কংগ্রেসের আবেদন খারিজ করলেন সুমিত্রা ।। ইন্দোরের কারখানা বেচে হিন্দমোটর পুনরুজ্জীবন? ।। পায়ে বল নিয়েই ভোটের ময়দানে নেমে পড়লেন দীপেন্দু ।। ৩০ আগস্ট পর্যম্ত বাস ধর্মঘট নয় ।। চৌরঙ্গি: বামপ্রার্থী আনোয়ারা?
উত্তর সম্পাদকীয়

টেকচাঁদ ঠাকুর: বাংলা ভাষার টেক অফ

টেকচাঁদ ঠাকুর: বাংলা ভাষার টেক অফ

Google plus share Facebook share Twitter share LinkedIn share

অসিত দাস

আমবাঙালি মনীষীদের জন্মশতবার্ষিকী ও ‘শ্রাদ্ধ’ জন্মশতবার্ষিকী পালনে এতই আগ্রহী যে ২৪ জুলাই, ২০১৪-য় প্যারীচাঁদ মিত্রের দ্বিশতবার্ষিকী যে নীরবে পার হয়ে গেল, সেদিকে কারও হুঁশ নেই৷‌ টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে ১৮৫৭-৫৮-য় তিনি লিখেছিলেন ‘আলালের ঘরের দুলাল’৷‌ এটিই বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সার্থক উপন্যাস৷‌ যদিও শিবনাথ শাস্ত্রীর মতো কেউ কেউ এর সঙ্গে অধুনা বাংলাদেশের কুমারখালির হরিনাথ মজুমদার (কাঙাল হরিনাথ) রচিত ‘বিজয় বসম্ত’র নামও করে থাকেন প্রথম বাংলা উপন্যাস হিসেবে৷‌ কিন্তু কাঙাল হরিনাথও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্তের সংস্কৃতবহুল বাংলা ভাষারই শরণাপন্ন হয়েছিলেন৷‌ সেখানে টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ থেকেই যেন আসল প্রাপ্তবয়স্ক বাংলা উপন্যাস টেক অফ করল৷‌ বাবুরামবাবু, ঠকচাকা, বাঞ্ছারামবাবু, মতিলাল প্রভৃতি চরিত্রগুলি যেন বঙ্গজীবনের নিম্নবর্গ বা প্রাম্তিক জনের ভাষা আমদানি করল বাংলা উপন্যাসে৷‌ যদিও যুগাম্তকারী সে-ভাষা ছিল কিঞ্চিৎ গুরুচণ্ডালী দোষে দুষ্ট এবং সোমপ্রকাশ-সম্পাদক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ এই ‘আলালি’ ভাষাকে বিস্তর গালমন্দ করেছিলেন, তবুও কালের নিরিখে ‘আলালি’ ভাষা একটি মাইলস্টোন হয়ে রয়ে গেল৷‌ পণ্ডিতস্মন্য নিন্দুকদের শত অভিশাপেও আলালের ঘরের দুলালের মৃত্যু হয়নি, বরং (ঞ্জ) কালীপ্রসন্ন সিংহ রচিত ‘হুতোম পেঁচার নকশা’ (১৮৬২) ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৪)-তে

আলালি ভাষার যথেষ্ট প্রভাব আছে বলেই বাংলা সাহিত্যের তাত্ত্বিক পণ্ডিতগণের বিশ্বাস৷‌

প্যারীচাঁদ মিত্রের পিতৃপুরুষের ভিটে হুগলি জেলার হরিপালের পানিশেওলা গ্রামে৷‌ তাঁর বাবা রামনারায়ণ মিত্র কৈশোরেই উত্তর কলকাতায় চলে যান ও ইউরোপীয় কোম্পানির বেনিয়ান বা মুৎসুদ্দি হিসেবে প্রচুর ধনসম্পদ উপার্জন করেন৷‌ প্যারীচাঁদ মিত্র হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন৷‌ তিনি ডেভিড হেয়ার ও ডিরোজিওর বিশেষ প্রিয়পাত্র ছিলেন৷‌ উত্তর কলকাতার নিমতলায় তিনি ছাত্রাবস্হাতেই নিজের বাড়িতে অবৈতনিক পাঠশালা স্হাপন করেন এবং ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে ইংরেজি ভাষা শেখাতে থাকেন৷‌ এ-কাজে তাঁকে সাহায্য করেন বন্ধু রসিককৃষ্ণ মল্লিক ও শিবচন্দ্র দেব৷‌ লোকশ্রুতি এই যে, স্বয়ং ডিরোজিও এবং ডেভিড হেয়ার এই অবৈতনিক পাঠশালার পরিদর্শক ছিলেন৷‌

উত্তর কলকাতার ভূমিপুত্র হলেও টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসটি প্যারীচাঁদ রচনা করেন হুগলির বৈদ্যবাটিতে৷‌ উপন্যাসটিতে বাবুরামবাবু বৃত্তাম্তই শুরু হচ্ছে ‘বৈদ্যবাটি’তে৷‌ ‘আলালের ঘরের দুলাল’ সম্পর্কে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন– ‘যে ভাষা সকল বাঙ্গালীর বোধগম্য এবং সকল বাঙ্গালী কর্তৃক ব্যবহূত, প্রথম তিনিই (টেকচাঁদ) তাহা গ্রম্হ প্রণয়নে ব্যবহার করিলেন৷‌’ দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণ’ ও ‘জামাই বারিক’-এর মতো উপন্যাসই শুধু রচনা করেননি, তিনি কবিতাও লিখতেন৷‌ টেকচাঁদ ঠাকুর সম্বন্ধে তিনি লিখলেন–

সহজ ভাষার পাতা, পণ্ডিত বিশাল,

প্যারীচাঁদ আলালের ঘরের দুলাল৷‌

এই দীনবন্ধুর নীলদর্পণ ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে কী ফ্যাসাদেই না পড়েছিলেন রেভারেন্ড জেমস লং৷‌ মাইকেল মধুসূদন দত্তই নেপথ্যে থাকা অনুবাদক কি না তা আজও বিতর্কিত৷‌ ইংরেজ সরকার লং সাহেবের এক হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে এক মাস কারাদণ্ড ঘোষণা করে৷‌ হুতোম পেঁচার নকশার লেখক কালীপ্রসন্ন সিংহ সিংহহৃদয়ে দিয়ে দেন জরিমানার টাকা৷‌ বেঁচে গেলেন পাদরি লং সাহেব সে-যাত্রা৷‌ এই মহামতি লং সাহেব প্যারীচাঁদ মিত্রের বাংলা ও ইংরেজি রচনার এতই গুণমুগ্ধ ছিলেন যে, তিনি প্যারীচাঁদ মিত্রকে ‘(চার্লস) ডিকেন্স অফ বেঙ্গল’ বলে ডাকতেন৷‌ আলালের ঘরের দুলালেই প্রথম সাব-অল্টার্ন বাংলা ভাষার ছায়াপাত ঘটেছিল৷‌

এটাই অবাক করার মতো ব্যাপার যে, প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর অন্যান্য পুস্তকে আর আলালি ভাষা ব্যবহার করেননি৷‌ অভেদা, যৎকিঞ্চিৎ, বামাতোষিণী, রামারঞ্জিকা, আধ্যাত্মিকতা প্রভৃতি উপন্যাস বা প্রবন্ধের বইয়ে তিনি বঙ্কিমী ভাষার প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন৷‌ কিছুটা আলালি ভাষার গন্ধ তিনি রেখেছেন ‘মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কী উপায়’ বইটিতে৷‌ প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুরকে বাংলা সংবাদপত্র জগতের বিশেষভাবে স্মরণ করা উচিত এই জন্য যে, তিনি ছিলেন প্রকৃত প্রস্তাবে একজন উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন সাংবাদিক৷‌ ‘আলালের ঘরের দুলাল’ লেখার কয়েক মাস আগে মাউন্ট এভারেস্ট জরিপকারী বাঙালি রাধানাথ শিকদারের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি প্রকাশ করেন ‘মাসিক পত্রিকা’৷‌ এটি লোকপ্রিয় বাংলা ভাষাকে প্রাধান্য দিত ও অচিরে জনপ্রিয়তা লাভ করে৷‌ তা ছাড়া তিনি দ্বিভাষিক ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন৷‌ রসিককৃষ্ণ মল্লিক, রামগোপাল ঘোষ এ ব্যাপারে ছিলেন তাঁর সহযোগী৷‌ এখনকার ইংরেজি ভাষার বাঙালি লেখকদের মতো ব্যুৎপত্তি তিনি সেকালেই দেখিয়ে ছিলেন বিভিন্ন ইংরেজি পত্রিকায় ফিচার ও প্রবন্ধ লিখে৷‌ ইংলিশম্যান, হিন্দু প্যাট্রিয়ট, ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া, ক্যালকাটা রিভিউ, বেঙ্গল হরকরা, বেঙ্গল স্পেক্টেটর, ইন্ডিয়ান ফিল্ড প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন৷‌ তাঁর সহোদর ভ্রাতা কিশোরীচাঁদ মিত্রও ছিলেন নামজাদা ইংরেজি ভাষার প্রাবন্ধিক৷‌ একালের অমিতাভ ঘোষ, অমিত চৌধুরি, উপমন্যু চট্টোপাধ্যায়, ঝুম্পা লাহিড়ীরা কি একটা বাংলায় ‘আলালের ঘরের দুলাল’ চেষ্টা করেও লিখতে পারবেন? নাকি নাক সিঁটকিয়ে শতহস্ত দূরে থাকতেই পছন্দ করবেন? চ্যালেঞ্জটা রাখলাম৷‌

পরবর্তীকালে প্যারীচাঁদ মিত্রের শিল্পোদ্যোগী হয়ে পড়া ও ব্যবসায় সাফল্যলাভ এবং বিভিন্ন কোম্পানির ডিরেক্টর বনে যাওয়া– এ সব ইতিহাসের ছাত্রদের মুখস্হের বিষয়৷‌ যেমন প্রেততত্ত্ব ও পারলৌকিক বিদ্যার চর্চা ও থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তাঁর বার্ধক্যজনিত মানসবিভ্রম৷‌ সে-যুগে প্ল্যানচেটটা যেন একটা কাল্টে পরিণত হয়েছিল৷‌ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও মুক্তি পাননি এর হাত থেকে৷‌ স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব যখন দু-দুটি নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়া ভূতের দর্শন পেয়েছিলেন এবং স্বামী বিবেকানন্দ একটির, তখন একা টেকচাঁদকে দোষ দিয়ে লাভ কী!

যা-ই হোক, বাংলা ভাষা প্যারীচাঁদ মিত্রকে মনে রাখবে ‘আলালের ঘরের দুলাল’-এর জন্য৷‌ তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটে হুগলির হরিপালের পানিশেওলা৷‌ সেখানে কেউ তাঁর ভিটেয় একটা ধূপও জ্বালায়নি৷‌ আবার ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ বইয়ের লেখক শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন, ‘তাঁহার (প্যারীচাঁদের) মৃত্যুর পর তাঁহার স্বদেশীয় ও বিদেশীয় বন্ধুগণ সম্মিলিত হইয়া এক সভা করিয়া, তাঁহার দুই স্মৃতিচিহ্ন স্হাপন করিয়াছেন৷‌ মেটকাফ হলে তাঁহার এক ছবি আছে এবং কলিকাতার টাউন হলে এক প্রস্তর নির্মিত উত্তমাঙ্গ আছে৷‌’ কেউ একটা মালাও দিয়েছেন কি?


kolkata || bangla || bharat || bidesh || editorial || post editorial || khela ||
Error Report || archive || first page

B P-7, Sector-5, Bidhannagar, Kolkata - 700091, Phone: 30110800, Fax: 23675502/5503
Copyright © Aajkaal Publishers Limited

Designed, developed & maintained by   Remote Programmer Private Limited