স্বপ্নময় চক্রবর্তী: উপন্যাস সমগ্র •‌ রমানাথ রায় •‌ বাণীশিল্প •‌ ৩৫০ টাকা
‌সুখ শান্তি ভালোবাসা •‌ রমানাথ রায় •‌ সুজন •‌ ১২০ টাকা

‘আমি ভগবান নই। আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই কৃষ্ণের মতো আমার শতাধিক নাম নেই। আমার মাত্র কয়েকটি নাম আছে। মা আমাকে খোকা বলে ডাকে। বাবা আমাকে লাট্টু বলে ডাকে। কাকা আমাকে বাচ্চু বলে ডাকে। মামা আমাকে ভুতো বলে ডাকে। বন্ধুরা আমাকে লম্বু বলে ডাকে। অফিসে আমাকে.‌.‌.‌।’‌
রমানাথ রায়ের ‘‌আমরা এখন’‌ উপন্যাসটি এভাবেই শুরু। রক্তপরীক্ষায় যেমন দু–চার ফোঁটাই যথেষ্ট, তেমনই একজন বিশিষ্ট লেখকের লেখার যে কোনও কয়েকটি লাইনেই তাঁর বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। দেখুন, কমা নয়, দাঁড়ির ব্যবহার। আমি কমা বসাতাম। রমানাথ রায় দাঁড়ি বসিয়ে বাক্যটির সম্পূর্ণতা বোঝাচ্ছেন। মাত্র কয়েকটা নাম বলতে গিয়ে দেখাচ্ছেন— একই মানুষ কত রকম ভাবে অবস্থান করতে পারে। শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কটে গিয়ে গদ্যব্যঞ্জনা পৌঁছে যায়, এবং রমানাথ রায় সেটা খুবই আপাতনিরীহভাবে করেন।
‘‌আমি ভগবান নই।’‌ এই বাক্যটা শুধু বাক্যমাত্র নয়। এটি শাস্ত্রবিরোধী গদ্যদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কল্প। এই আন্দোলনের পুরোধা অমল চন্দ ১৯৭৫ সালে ‘‌ছাঁচ ভেঙে ফ্যালো’‌ পুস্তিকায় লিখেছিলেন— ‘‌লেখক কার মধ্যে আছেন সেটা ঠিক থাকা দরকার। তিনি যদি একাধিক চরিত্রের মধ্যে ঢুকে পড়েন, তাহলে তাঁর কোনও ব্যক্তিত্ব থাকে না। সবার মনের কথা তিনি কী করে জানবেন?‌ একমাত্র ভগবানই তা পারেন।’
ভগবান সব সময়ে দূরের। কখনও ভয়ের। নিজের শরিক নয়। রমানাথের লেখার নায়ক তাই ‘‌আমি’‌। রমানাথ উত্তম পুরুষে লেখেন। রমানাথ গ্রাম শহর নগর বন্দর আদিবাসী অঞ্চল চষে বেড়ান না। নিজের পরিধির মধ্যে অনায়াস থাকেন। আর এটাই ওঁর বৈশিষ্ট্য।
সত্তরের দশক ছিল টালমাটাল সময়। ছাঁচ বা ছক ভেঙে ফেলার সময়। নানারকম ভাঙচুর হয়েছিল গতানুগতিকতায়। এই সময়ে গল্প বেড়া ভেঙে ব্যাপ্ত হয়েছে। বিষয় ভাবনায় নতুনতর হয়েছে, আঙ্গিকের দিকেও তা–ই। এই সময় ‘‌শাস্ত্রবিরোধী’‌, ‘‌হাংরি’‌, ‘‌নিমসাহিত্য’‌, ‘‌নতুন নিয়ম’‌ ইত্যাদি ধারা–উপধারা তৈরি হয়েছিল। সেগুলো এখন আর স্রোতবান নয় যদিও, কিন্তু এখনকার সাহিত্যকর্মে সেই ছাঁচভাঙার চিহ্ন রয়ে গেছে। আমি এ কথা বিশ্বাস করি যে, ওঁদের সেই দুঃসাহস পরবর্তী লেখকদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছিল (‌টিকা নেওয়া সত্ত্বেও আমার মধ্যেও কিছুটা সংক্রমণ ঘটেছিল মনে হয়)‌।
শাস্ত্রবিরোধী লেখকদের সংঘ ভেঙে গেছে বহুদিন, অনেকেই আঙ্গিক পাল্টেছেন, কিন্তু রমানাথ রায় তাঁর মূল জায়গায় স্থির আছেন। ছকবাঁধা কাহিনীর মধ্যে নেই। কিন্তু মায়াগদ্যজালে ধরা পড়ে যায় প্রাত্যহিক সামাজিক সমস্যা আর অসঙ্গতিগুলো।
দুটি গ্রন্থ আমার সামনে। ‘‌উপন্যাস সমগ্র’‌ এবং ‘‌সুখ শান্তি ভালোবাসা’‌।‌ ১৯৮০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত মোট ১১টি উপন্যাস। আলোচনার জন্য বরাদ্দ ৬০০ শব্দ!‌ তো, কী করা যাবে!‌
‘‌ভালবাসা চাই’‌ উপন্যাসটির নায়ক কিছুদিন ছুটি নিল। ছুটির মধ্যেই মনে হল ও একা। এবং খবর কাগজে বিজ্ঞাপন দিল, বান্ধবী চাই। নায়কের এক বন্ধুর প্রশ্ন— বান্ধবী দিয়ে কী হবে?‌ উত্তর— ‘‌ভালবাসব’‌। কিন্তু বন্ধুটির চাই শরীর। বান্ধবী পাওয়া গেল, এবং ‌হৃদয় ও শরীর ভাগ করে নেওয়া নিয়ে এক জটিল উপন্যাস সরল বাক্যে এগোতে লাগল। একাধিক তথাকথিত ‘‌বান্ধবী’‌ ঢুকেছে উপন্যাসটিতে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সমস্যা। নায়ক এবং নায়কের বন্ধুর মধ্যেও এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। হৃদয় বনাম শরীরের উপন্যাস এটি নয়, আসলে এটি এগজিস্ট্যানসিয়ালিস্ট লেখা।
‘ছবির সঙ্গে দেখা’ উপন্যাসের বাইরের কাহিনী আলাদা হলেও ব্যক্তিসঙ্কট নিয়েই লেখা। আসলে রমানাথ রায়ের লেখায় গল্পটি মুখ্য নয়, প্রধান ব্যাপারটি হল ব্যঞ্জনা। এখানে ‘‌আমি’‌ চরিত্রটির বাল্যবয়সের সঙ্গিনী ‘‌ছবি’‌ দূর শহর কলকাতা চলে গেল। এবার নায়ক ছবিকে চিঠি লেখে, ছবি উত্তর দেয় না। অতঃপর ছবির পরিবর্তে ‘‌চিনু’‌কে নিয়ে ব্যস্ত হয়। কিন্তু সেটাও বেশি দিন নয়। আবার ছবিকে খুঁজতে কলকাতায়। দেখাও হয়, কিন্তু হয়তো সে অন্য কোনও ছবি। কিন্তু কাহিনীতে ঢুকে যায় লিপি, তুলি আরও সব চরিত্র, নাকি চরিত্রের কার্বন কপি কিংবা ক্লোন!
এই বিষয় নিয়ে পঞ্চাশ হাজার শব্দের উপন্যাস, অথচ একঘেয়েমি নেই। বারবার চমকে উঠতে হয় বাক্যবিন্যাসের বুদ্ধিদীপ্ত মুনশিয়ানায়। এবং আবার বলছি, কাহিনী নয়, অন্তর্গত দার্শনিক উপলব্ধিটাই আমাদের আনন্দ দেয়।
রমানাথ রায়ের লেখায় উইট এবং হিউমার থাকে। কখনও হালকা স্যাটায়ার। এর সঙ্গে যদি সামান্য ফ্যান্টাসিও মেশে, তখন কেমন হয়— সেটা বুঝতে গেলে পড়তে হবে দুটি উপন্যাস— ‘‌কাঁকন’‌ এবং ‘‌দেশপ্রেমিক’‌। কাঁকনের বুনন অনেকটা পরিচিত রূপকলার ঢঙে। কাঁকনের বয়স কুড়ি। ফর্সা রঙ, মাথাভর্তি চুল, টানা চোখ, সরু কোমর.‌.‌.‌। কিন্তু কাঁকনের মুখে হাসি নেই।
কাঁকনের বাবা কিন্তু কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। কিন্তু দিল্লি গিয়ে মন্ত্রী হয়ে পুরনো সংসারকে আর পাত্তা দেন না। আবার নতুন বিয়েও করে ফেলেছেন একটা। কাঁকনের ভাইয়েরা বাবাকে জানায়, কাঁকন হাসছে না, কিছু একটা করো। অর্থমন্ত্রী বাবা বলেন, কিছু টাকা পাঠিয়ে দেবেন, তাতেই মেয়ে হাসবে। কেউ বলে ডাক্তার দেখাও। ডাক্তার দেখানো হলে ডাক্তার হাত ধরে, গাল টিপে দেয়, চুমু খায়, জিজ্ঞাসা করে ভাল লাগছে?‌ কাঁকন বলে, ভাল লাগছে। ডাক্তার বলে, ওর বিয়ে দাও, তবেই ঠিক হয়ে যাবে। কাঁকন বিয়ে করতে রাজি হয়, কিন্তু ওই ডাক্তারকেই!‌ কিন্তু ডাক্তারটি বিবাহিত। ডাক্তারের স্ত্রী সতিন–গ্রহণে রাজি হল না। একদিন কাঁকনের ঘরে এল বিষ্ণুর বাহন গরুড়। গরুড় কাঁকনকে বিয়ে করতে রাজি হল। কিন্তু কাঁকনের ভাইয়েরা অর্ধেক পাখি অর্ধেক মানুষের সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইল না। কিন্তু গরুড়ও হাল ছাড়ল না। বিষ্ণুকে একটা ব্যবস্থা করার অনুরোধ করল। কিন্তু বিষ্ণু ধ্যানযোগে জানতে পারলেন, কাঁকন মনে মনে প্রধানমন্ত্রীকে ভালবাসে। প্রধানমন্ত্রী বনাম ভগবান বিষ্ণুর ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী চীন এবং আমেরিকার সাহায্য চায়.‌.‌.‌ কাঁকনকে ঘিরে স্বর্গ মর্ত্য পাতাল তোলপাড় হয়, কিন্তু কাঁকনের হাসি আসে না।
‘‌দেশপ্রেমিক’‌ উপন্যাসটিতে গান্ধীভক্ত এবং সুভাষভক্ত চরিত্র দুটি পল্লবিত হয়। লেখক এর ভেতরে প্রতিস্থাপিত করেন রাজনৈতিক ভণ্ডামি, শঠতা ইত্যাদি। ক্রমশ লেনিনভক্ত, বিবেকানন্দভক্ত চরিত্ররা আসতে থাকে, ক্রমশ উপন্যাসে ঢুকে যায় শৈব–শাক্তরা। জর্জ বুশের প্রিয়পাত্র ‘‌মিস্টার ফক্‌স’‌ও একটা চরিত্র হয়ে উপন্যাসে আসে এবং দেখতে থাকি বিশ্বজোড়া স্বার্থ অন্বেষণ। দেখি অস্ত্রবাজার। খুব সামান্য আয়োজনে রমানাথ গভীর থেকে গভীরতর বয়ানে চলে যেতে পারেন।
‘‌কর্ণকাহিনী’‌ উপন্যাসের একটি চরিত্রের শখ মন্ত্রীদের কান সংগ্রহ করা। এবং আশ্চর্যই হই যখন কান সংগ্রহ নিয়েই উপন্যাসটি এগোতে থাকে। রমানাথ রায়ের একটি প্রিয় চরিত্র হল ক্ষমতাবানেরা। ওঁদের মুখোশ উন্মোচন নয়, বরং ওঁদের কেমন যেন অসহায় রূপটি তুলে ধরেন। ক্ষমতাবানদের প্রতি পাঠকের করুণা হয়। ‘‌মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী’‌ তেমনই একটি উপন্যাস। ‘‌স্বেচ্ছাচারী’‌ উপন্যাসটিও মধ্যবিত্ত পারিবারিক আবহে শুরু হয়েছিল, কিন্তু কৌতুক–মিশ্রিত থ্রিলারের মতো হয়ে যায়।
‘‌সুখ শান্তি ভালোবাসা’‌ উপন্যাসটিতে রাজনীতি সেভাবে আসেনি। মানবসম্পর্কের আখ্যান। শুরুতে রনি আর মলি ঠিক করে ওরা বিচ্ছিন্ন হবে। শেষে দেখি, রনি আর মলি জোড়া লাগে ফের। রমানাথ রায়ের কয়েকটা উপন্যাস পড়তে গিয়ে মনে হতে পারে উনি সীমাবদ্ধ ‘‌স্পেস’‌–এ ঘোরাফেরা করছেন।
হয়তো ঠিক। কারণ উনি স্বধর্মচ্যুত হতে চান না। কনটেন্ট নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর দরকার নেই, মনে করেন। কিন্তু রমানাথ কারও উত্তরসূরি নন। কারও প্রভাব রমানাথে নেই। ওঁর কোনও পূর্বসূরিও নেই। রমানাথ রায় অনন্য।
হ্যাঁ, আর একটা কথা। উনি ওঁর বইয়ে ব্লার্ব দেন না। পুরোটাই পড়ে নিতে হয়।‌‌‌ 

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top