শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়:
মহাশ্বেতা দেবী, এক জীবনেই • অজয় গুপ্ত সম্পাদিত • দে’‌জ পাবলিশিং • ৬০০ টাকা
‌মহাশ্বেতা দেবী যখন তাঁর আত্মকথা লিখতে শুরু করলেন এবং ‘‌সিরিয়াল’‌–এর ধারাবাহিকতায় ছ’‌বছর ধরে তা ‘‌প্রমা’‌ পত্রিকায় লিখে চললেন, তখন তাঁর লেখিকাজীবন কার্যত শেষ হয়ে গেছে, নব্বুইয়ের দশকে ‘‌নিরানব্বুইয়ের গল্প’‌ নামে সংকলিত তিনটি গল্প (‌‘‌শেষ শামালিন’‌, ‘‌কুন্তী ও নিষাদী’‌, ‘‌ঝুক্কু ঝুক্কু ঝুক ঝুক আ গিলা’‌)‌ ছাড়া তাঁর আর কোনও উল্লেখযোগ্য রচনা নেই, ‘‌বিমুক্ত’‌ জনজাতিদের স্বাধিকার ও সুযোগ আদায়ের অভিযানেও তাঁর ভূমিকা ততদিনে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও সম্মানভারে স্থবির, তাঁর যা–কিছু ব্যস্ততা তা জনসংযোগে, সাহায্য–ও–সুযোগপ্রার্থীদের জন্য প্রভাবশালীদের কাছে সুপারিশ আদান–প্রদানে!‌ পত্রিকার এক সংখ্যা থেকে আরেক সংখ্যায় লেখা টেনে নিয়ে যাওয়ার দায়ভারে ব্যাহত স্বতঃস্ফূর্ততায় প্রায়ই খেই হারিয়ে যায়, পুনরুক্তি ঘটে, আখ্যান কখনওই দানা বেঁধে অনর্গল স্বচ্ছন্দতা লাভ করে না। ‘‌এক জীবনেই’‌ রচনাটির এই অসম্পূর্ণতা বিবেচনা করেই ‘‌মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র’‌, ‘‌মহাশ্বেতা দেবী অমনিবাস’‌–এর একনিষ্ঠ সুদক্ষ সম্পাদক অজয় গুপ্ত ‘‌এক জীবনেই’‌ স্মৃতিকথাটির সঙ্গে আগে–পরে প্রকাশিত অনেকগুলি স্মৃতিকথা যুক্ত করে একটি ‘‌স্মৃতিকথা সংগ্রহ’‌ তৈরি করে দিয়েছেন যাতে মহাশ্বেতা দেবীর সম্পূর্ণতর এক জীবনভাষ্য উঠে আসে। 
‘‌এক জীবনেই’‌ শুরু করেই মহাশ্বেতা দেবী দ্রুত তাঁর যে আত্মচারিত্র‌্য প্রতিষ্ঠা করেন, তাতে কিছু স্পষ্ট স্বীকারোক্তি আছে:‌ ‘না বুঝি কম্যুনিজ্‌মের রাজনীতিক ভিত্তি। না পড়েছি মার্কস। লেনিন বা এঙ্গেল্‌স্‌। তত্ত্ব সেদিনও পড়িনি। আজও পড়িনি। থাকার মধ্যে ছিল রোমান্টিক আদর্শবাদ। আজ বিশ্বাস করি, তার জোরেই বেঁচে আছি।’‌ রোমান্টিক আদর্শবাদমাত্র সম্বল করে কি বাঁচা যায়?‌ রাজনীতিবৈরাগ্য নিয়ে যেন বা একটা আত্মশ্লাঘাই মহাশ্বেতা দেবীর জীবন ও সাহিত্যকর্ম, দুটোকেই বেশ খানিকটা খর্ব করে দেয়। মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যজীবনে যে তিনটি স্পষ্ট পর্বভাগ, তার দ্বিতীয়টিতে অবশ্যই ‘‌বায়স্কোপের বাক্স’‌ নামে সেই অসামান্য রচনাটি চিনিয়ে দেয় মহাশ্বেতার মনের অন্দরের নির্মাণ, সাবেকি বৃহত্তর পরিবারের অন্দরমহলে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ জুড়ে ‘‌সম্মানিতা’‌ স্বাধীনা নারীদের পরম্পরায় তাঁর সহজাত অবস্থান— যেখানে সংসারের কিছু বিধিনিষেধ ও শাসন মেনে নিলে নারী নিরাপদ আশ্রয়ে জীবন কাটিয়ে যেতে পারেন, প্রতিদানে দিতে হয় নীরব মান্যতা। তাঁর আত্মকথার দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতেই মহাশ্বেতা কী অমোঘ সত্যকথনে নিজেকে তাঁরই লেখা ‘‌বায়স্কোপের বাক্স’‌–র শেলীমাসির সঙ্গে তুলনা করেন!‌ তাঁর রচনাধারার প্রথম পর্বে তাঁর ‘‌আশ্রিত’‌ জীবনযাত্রার জীবনাভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতাকেই উত্তীর্ণ হতেই তাঁর ইতিহাসচারণা, যার পরিণাম ‘‌অমৃত সঞ্চয়’‌, ‘‌আঁধারমাণিক’‌, ‘‌কবি বন্দ্য–ঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’‌ (‌এই ইতিহাসচারণার শুরু অবশ্যই ‘‌ঝাঁসির রানী’‌ থেকেই)‌, যেখানে ইতিহাস ঐতিহাসিক চরিত্রদের দাপুটে উপস্থিতি বা ইতিহাসবিদদের তথ্যভার পেরিয়ে এক চলমান মানবসমাজের ভাব, আবেগ, বোধ, ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার কল্পনাজারিত আখ্যানে ইতিহাসকে মূর্ত করে।
আত্মস্মৃতিচারণায় মহাশ্বেতা দেবী সতর্ক, সাবধানী, অনেক কথাই বলতে চান না;‌ আবার কোনও কোনও বিষয়ে কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যা দিতে একটু বেশি তৎপর, যেমন বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিয়ে ভাঙার প্রশ্নে!‌ অথচ তাঁর ইতিহাসভাবনা ও সেই ভাবনায় নিজে অকুস্থলে গিয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সত্য আবিষ্কারের প্রেরণা ও সেই প্রয়াসেরই অঙ্গরূপে স্থানীয় ভাষার চর্চা ও প্রয়োগের পথিকৃৎ কিন্তু বিজন ভট্টাচার্যই, সে কথা স্বীকার করতে তিনি প্রস্তুত নন। ঠিক তেমনই আবার মৈত্রেয় ঘটক ও নির্মল ঘোষ যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টির আলোকে বা কুমার সুরেশ সিং ক্ষেত্রসমীক্ষার যে বিপুল সম্পদে তাঁকে পুষ্ট করে তাঁর ‘‌অগ্নিগর্ভ’‌, নৈর্ঋতে মেঘ’‌ ও ‘‌স্তন্যদায়িনী ও অন্যান্য গল্প’–এর অটল ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন, তার স্বীকৃতি থাকলে পরে তাঁর বাস্তবপাঠ কেন ক্ষীণপ্রাণ হতে থাকে, তার একটা ব্যাখ্যা হয়তো পাওয়া যেত। বাস্তবপাঠে রাজনীতিবোধের কোনও বিকল্প নেই, জাত–রোম্যান্টিকদের জগৎটাই আলাদা থেকে যায়। চেনাজানা বিভিন্ন ব্যক্তিদের স্মরণলিপিতে বা পুত্র নবারুণের সঙ্গে দূরত্ব–বিচ্ছেদের (‌আরও জোর দিয়েই বলা যায়, নবারুণের সবল প্রত্যাখ্যানে)‌ বয়ানে সেই রোম্যান্টিক মনের আর্তি আছে, গভীর বেদনাবোধ আছে, নিজের লেখকজীবনের বন্ধ্যাত্বের একটা প্রচ্ছন্ন যন্ত্রণাও আছে।‌ ■

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top