প্রদীপকুমার দত্ত: সাম্প্রতিক গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের ফল দেশের গ্রামীণ ক্ষেত্রে বিজেপি–র ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। ১৯৯৫ সালে প্রথম গুজরাটে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এবারের নির্বাচনেও বিজেপি সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলেও এবার তারা পেয়েছে মাত্র ৯৯টি আসন। অতীতের পাঁচবারে মোট ১৮০টি আসনের মধ্যে তাদের আসনসংখ্যা ১১৬–এর নিচে নামেনি কোনও বার। কংগ্রেস এবার পেয়েছে ৮০টি আসন। নির্বাচনের আগে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছিলেন, তাঁরা ১৫০টি আসন পাবেন। তাঁর সেই প্রত্যাশা পূরণ তো হয়ইনি, এমনকী গতবারের জেতা সব আসনও তাঁরা ধরে রাখতে পারেননি। ১৮টি আসন খুইয়েছেন, আর ৩১টি আসনে জয়লাভ করেছেন নামমাত্র ব্যবধানে। অথচ এই নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। প্রচারে   নামিয়েছিল দলের আটজন মুখ্যমন্ত্রীকে। সেখানে জয়লাভ করতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর নিজের রাজ্য গুজরাটে চরকির মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি একাই করেছিলেন ৬৪টি জনসভা। নির্বাচনের আগে মনে হচ্ছিল, নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নন, শুধুমাত্র গুজরাটের নেতা। প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনিই হয়ে ওঠেন গুজরাটে  ভোটের প্রচারের প্রধান মুখ। গত তিন মাসে বহুবার তিনি বলেছেন, ‘আমি গুজরাটের সন্তান’, ‘আমার অপমান, গুজরাটের অপমান’, ‘ঘরের ছেলেকে ভোট দিন’ প্রভৃতি শব্দবন্ধগুলি। প্রচারে নেমে তিনি তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদের মর্যাদার কথাও মনে রাখেননি। দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনের আগে তিনি প্রচারকে আবেগ ও অসত্য-নির্ভর করে তুলেছিলেন।   
এর আগে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে ‘গুজরাট মডেল’–এর যে ঢক্কানিনাদ করা হয়েছিল এবারের প্রচারে তা অনুপস্থিত ছিল। নির্বাচনী বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও হিন্দু–মুসলমানের মেরুকরণের রাজনীতিই এবারে প্রচারের প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল। বক্তৃতায় কোথাও ‘আচ্ছে দিন’-এর উল্লেখ করেননি নরেন্দ্র মোদি বা তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা, জেতার জন্য হিন্দুত্ব ও সাম্প্রদায়িকতাকেই তাঁরা আশ্রয় করেছিলেন। ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’ স্লোগানও শোনা যায়নি। স্বাধীনতার পর ৭০ বছর ধরে বঞ্চিত, প্রতারিত হতে হতে সঙ্কটের আবর্তে পড়া মানুষ এর আগের নির্বাচনগুলিতে বিজেপির ‘বিকাশ’ আর ‘আচ্ছে দিন’–এর প্রচারে আস্থা রেখেছিল; কর্পোরেট সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলি নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপিকে দেশের ত্রাতা হিসেবে তুলে ধরেছিল। মানুষ এইসব প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে ভেবেছিল বিজেপি সত্যিই তাঁদের জীবনের সমস্যাগুলির সমাধান করবে, ‘আচ্ছে দিন’ আনবে। কিন্তু তাদের ২২ বছরের শাসনে মানুষ তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন বিজেপির উন্নয়নের প্রচারের লক্ষ্য ছিল লোক ঠকিয়ে ভোটে ফয়দা তোলা– গদি দখলের জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি মাত্র। তাদের শাসনে শিল্পপতি ও কর্পোরেট সংস্থাগুলি লাভবান হয়েছে, আর গরিব মানুষ, গ্রামের মানুষ, শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত মানুষের অবস্থা দিন–দিন খারাপ হয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যেই সাধারণ মানুষ টের পেয়েছেন ‘গুজরাট মডেল’ আসলে এক ভয়ঙ্কর মডেল। মানুষ যে তাঁদের প্রতারণা বুঝতে পেরেছেন, তা বুঝতে বাকি থাকেনি বিজেপি নেতাদেরও। তাই তাঁরা আর ‘উন্নয়ন’, ‘বিকাশ’ বা ‘আচ্ছে দিন’-এর কথা না বলে নগ্ন সাম্প্রদায়িক প্রচার করেছেন।  
শহরকেন্দ্রিক চারটি জেলা— আমেদাবাদ, সুরাট, বদোদরা ও রাজকোটের ৫৫টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৪৬টিতে জিতেছে, আর ১২৭টি গ্রামীণ আসনের মধ্যে তারা জিতেছে মাত্র ৫৩টি আসনে, সেখানে কংগ্রেস পেয়েছে ৭১টি আসন। অর্থাৎ গ্রামীণ গুজরাটের মানুষ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর কারণ তথাকথিত ‘গুজরাট মডেল’–এর যে সুফল তা পেয়েছেন ওপরে উল্লিখিত চারটি শহরকেন্দ্রিক জেলার মানুষেরা; আর গ্রামের গরিব মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত মানুষ তার থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছেন। শহরগুলিতে যখন আলো ঝলমল করছে, হাইওয়ে, উড়ালপুল, ব্রিজ প্রভৃতি হচ্ছে তখন গ্রামীণ গুজরাটের কৃষকরা ফসল, তুলোর দাম না পেয়ে ঋণে জর্জরিত হয়ে আত্মহত্যা করছেন। গ্রামে পানীয় জলের সংযোগ আছে খুব কম জায়গায়। তাই গ্রামের মানুষকে পানীয় জল আনতে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হচ্ছে। যদিও এর আগে প্রধানমন্ত্রী থেকে বিজেপির অন্য নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁরা ক্ষমতায় এলে চাষীরা ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন, যেসব জায়গায় জলের অভাব আছে সে সব জায়গায় নর্মদার জল পৌঁছে দেবেন। নির্বাচনে জেতার পর যথারীতি তাঁরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। গ্রামগুলিতে স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির ভগ্নদশা। শিল্পপতি ও কর্পোরেট হাউসের জন্য অঢেল ব্যাঙ্কঋণের ব্যবস্থা থাকলেও গ্রামের কৃষকরা চাষের জন্য মহাজনের কাছে বেশি সুদে টাকা ধার করতে বাধ্য হন। বিজেপি–র বিরুদ্ধে গ্রামের মানুষের ক্ষোভের স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে এবারের গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে। সামনেই কেন্দ্রীয় বাজেট এবং এই সরকারের এটিই শেষ পূর্ণাঙ্গ সারা বছরের বাজেট। গ্রামের মানুষের ক্ষোভ নিরসনে এই বাজেটে সরকার কি কিছু করবে?‌
শহরগুলির শিল্পপতি ও বণিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন বিজেপি সরকারের থেকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধে পেয়ে আসছেন। তাই তাঁরা বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক। এবার প্রথম দিকে জিএসটি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ তীব্র হলেও তা বুঝে জিএসটির হার কিছুটা কমিয়ে দিয়ে তাঁদের ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত করা হয়েছিল। 
বিজেপি নেতারা বলেছিলেন, গুজরাটকে শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলবেন যেখানে রাজ্যের বেকাররা কাজ পাবেন। অথচ শিল্প যতটুকু হয়েছে, তাতে লাভবান হয়েছেন শুধু আদানির মতো মুষ্টিমেয় কিছু শিল্পপতি। বেকাররা বেকারই থেকে গেছেন। শিল্প-মালিকরা বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে জমি পেয়েছেন, জল-বিদ্যুৎ আর ট্যাক্সে ছাড় পেয়েছেন। গুজরাটের শিল্প–আইনে শ্রমিকদের অবাধে শোষণের ছাড়পত্র মালিকরা পেয়েছেন, ন্যূনতম মজুরি আইন সে রাজ্যে কার্যকর হয় না। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ‘গুজরাট মডেল’–এর যে মোহ ছিল, তা ভেঙে গেছে। আবার নোট–বাতিলের ফলে গ্রামের মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গ্রাম থেকে শহরে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে গ্রামে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। বিজেপির সাম্প্রদায়িক প্রচারও গ্রামের মানুষকে বিশেষ প্রভাবিত করেনি, যা করেছে শহরের সচ্ছল সুবিধেভোগী মানুষদের। তাই গ্রামীণ এলাকাগুলির মানুষ বিজেপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারেননি। তার অর্থ অবশ্য এই নয় যে মানুষ কংগ্রেসের ওপর আস্থা স্থাপন করে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন। নিরুপায় মানুষ কোনও উপযুক্ত বিকল্প না পেয়ে বিজেপির ওপর ক্ষোভ থেকে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন। বিজেপির ওপর মানুষের এই ক্ষোভ বুঝে কংগ্রেসও নেমে পড়েছিল নানা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণকে প্রতারিত করতে। যেমন, রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে দশ দিনের মধ্যে কৃষিঋণ মকুব করবেন। তিনি কিন্তু একবারও গুজরাটে বিজেপির সবচেয়ে বড় অপরাধ ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদির মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় সংখ্যালঘু–নিধন নিয়ে কোনও কথা বলেননি। বরং তিনিও বিজেপি নেতাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ২৭টি হিন্দু মন্দিরে গিয়েছিলেন হিন্দুদের ভোট পাওয়ার আশায়। তবে নোটায় ১.৮ শতাংশ ভোট পড়া থেকে বোঝা যায় ১.৮ শতাংশ ভোটার কোনও প্রার্থীর ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। কংগ্রেস এই জয়ে উল্লসিত এবং একে রাহুল গান্ধীর সাফল্য বলে প্রচার করছে কারণ  প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যে গিয়ে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি এতগুলি আসনে কংগ্রেসকে জিতিয়ে এনেছেন। অন্যদিকে  বিজেপির প্রতি মানুষের ক্ষোভ লক্ষ্য করে প্রচার মাধ্যমগুলিও রাহুল গান্ধীকে বিকল্প নেতা হিসেবে তুলে ধরেছে। মানুষ ভুলে গেছেন যে স্বাধীনতার পর কংগ্রেস কেন্দ্রে ও বিভিন্ন রাজ্যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলেও সাধারণ মানুষের অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি, তারাও শিল্পপতি ও কর্পোরেট হাউসগুলির স্বার্থরক্ষা করেছে, যেমন বিজেপি ও যে দলই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তারাই করে। কোনও দলের শাসনে মানুষ যখন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন, তখন প্রচারমাধ্যমগুলি অন্য কোনও দল বা জোটকে তার বিকল্প হিসেবে তুলে ধরে এবং অসচেতন মানুষ তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সরকার পরিবর্তন করেন। কিন্তু সব দলগুলিই শিল্পপতি ও কর্পোরেট হাউসগুলির স্বার্থরক্ষাকারী হওয়ায় সাধারণ মানুষ যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যান। 
লেখক প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান
 

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top