কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত:  পূর্বভূমিকা অথবা মাংসাহার প্রবর্তন
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়, ৩০৯ নম্বর মন্টেরি রোডে ‘‌মিড পরিবারে’‌ স্বামীজি সময় কাটিয়েছিলেন কিছুদিন। ‘‌মিড ভগিনীদের’‌ দুজন, হেলেন এবং হ্যান্সবোর ছিলেন স্বামীজিঅন্ত প্রাণ। ১৮৯৯–‌এর ডিসেম্বরে কিংবা তার কিছু পরের ঘটনা এটা। মেরি লুইস বার্ক, যিনি সিস্টার গার্গী নামেই পরিচিত, তঁার রচনায় সেই দিনগুলোর বিবরণ আছে। সেখানকার একটি বিবরণ:‌ ‘‌স্বামীজী প্রায়ই সকালের ক্লাস সেরে দু–‌একজন অতিথি নিয়ে মধ্যাহ্নভোজনের সময় ফিরতেন। আর তঁাদের সঙ্গে যোগ দিতেন লস্‌ এঞ্জেল্‌স্‌ থেকে আগত কুমারী ম্যাকলাউড ও শ্রীমতী লেগেট। একদিন শ্রীমতী লেগেট উপস্থিত রয়েছেন। স্বামীজী এদিক–ওদিক পায়চারি করতে করতে বলছেন, ‘‌প্রকৃতপক্ষে বৃটিশরা ভারত জয় করতে আসেনি, তারা এসেছিল হিন্দুদের একটি শিক্ষা দিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই, এদেশে আগত ইংরেজ সৈনিক, এমন কি পদস্থ কর্মচারীরাও বড় নিম্নমানের মানুষ। একদিন আমি একটি মাঠের ধারে ফুটপাথে বসেছিলাম, আর দুটি সৈনিক পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের একজন আমাকে পদাঘাত করে চলে যায়। আমি বললাম, ‘‌তুমি কেন একাজ করলে?‌’‌ সে বিশ্রী গালি দিয়ে বললে ‘‌আমার খুশি‌।’‌ আবার আমরাও তোমাদের কম বলিনি। আমরা তোমাদের বলি, ‘‌অপরিচ্ছন্ন, ম্লেচ্ছ ইত্যাদি।’‌ তারপর বৃটিশ সৈনিকরা কেমন করে নিম্নবর্ণের ভারতীয় স্ত্রীলোকদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করেছে তার কথাও বললেন। বলেছিলেন যদি কোন ইংরেজের বাড়িতে ঢুকে কেউ ব্যভিচার করে তো সে তাকে তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলে— আর তাই তো করা উচিত। কিন্তু সেক্ষেত্রে হিন্দুরা কেবল বসে বসে বিলাপ করে। স্বামীজীর সদা অনুবর্তিনী শ্রীমতী লেগেট ভাবাপ্লুত হয়ে নিরীহ হিন্দুদের প্রশংসা করে বললেন, ‘‌আহা, কি সুন্দর!’‌‌ স্বামীজী বললেন, ‘‌তোমরা কি মনে কর যদি আমাদের জাতের জঙ্গী মনোভাব থাকত, তবে এই মুষ্টিমেয় ইংরেজ সেনা এত বড় ভারত শাসন করতে পারত?‌ আমি সারা ভারতে মাংসাহার প্রবর্তন করতে চাই— যাতে দেশটার মধ্যে জঙ্গী মনোভাব জাগে।’‌
স্বামীজী যদি এখন জানতে পারতেন যে, আরএসএস এই দেশটাকে নিরামিষাশী বানাবার ফতোয়া জারি করেছে?‌ শুধু এইটুকুই নয়। সংবিধানও বদলে দেওয়া হবে বলে হুমকি শুরু হয়েছে। নিরামিষ গোরক্ষকদের নির্মম আক্রমণে একের পর এক মুসলিম খুন হচ্ছেন। ‘‌মাংসাহার’‌ প্রবর্তন করার দরকার পড়েনি। নিরামিষ খেয়েই একদল ‘‌বীর’,‌ খুন, সন্ত্রাস, ষড়যন্ত্র নিখুঁতভাবেই চালাচ্ছে। আরএসএস বলে দিয়েছে, ভারতীয় সংস্কৃতি মানেই ‘‌হিন্দু সংস্কৃতি’‌ এবং সব ভারতীয়ই ‘‌হিন্দু!‌’‌ মসজিদ ভেঙে, গির্জা পুড়িয়ে, দেশজুড়ে জাত–‌ধর্মের কুৎসিত রাজনীতি অত্যন্ত সক্রিয় হয়েছে। এভাবেই ভারতকে ‘‌হিন্দুরাষ্ট্র’‌ করার ছক কষেছে আরএসএস। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার প্রশাসনিক মদত দিচ্ছে এই কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য। এই হল এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট।
ধর্ম বিষয়ে ‌বিবেকানন্দ
ধর্ম বাক্যাড়ম্বর নহে, অথবা মতবাদবিশেষ নহে, অথবা সাম্প্রদায়িকতা নহে। সম্প্রদায়ে বা সমিতির মধ্যে ধর্ম আবদ্ধ থাকিতে পারে না। ধর্ম আত্মার সহিত পরমাত্মার সম্বন্ধ লইয়া। ধর্ম কিরূপে সমিতিতে পরিণত হইবে?‌ ‌কতকগুলি ভোটের সংখ্যাধিক্য হইলেই কি মানুষ অধিক ধার্মিক হইবে, অথবা উহার সংখ্যাল্পতায় কম ধার্মিক হইবে?‌ মন্দির বা চার্চ–নির্মাণ অথবা সমবেত উপাসনায় ধর্ম হয় না, কোন গ্রন্থে, বচনে, অনুষ্ঠানে বা সমিতিতেও ধর্ম পাওয়া যায় না। আসল কথা— অপরোক্ষানুভূতি। ধর্ম অনুরাগে, বাহ্য অনুষ্ঠানে নহে। হৃদয়ের পবিত্র ও অকপট প্রেমেই ধর্ম।
কোনও ব্যক্তি যে পথে চলিতে ইচ্ছা করে তাহাকে সেই পথে চলিতে দিতে হইবে;‌ কিন্তু যদি আমরা তাহাকে অন্য পথে টানিয়া লইয়া যাইতে চেষ্টা করি, তবে তাহার যাহা আছে, সে তাহাও হারাইবে, সে একেবারে অকর্মণ্য হইয়া পড়িবে। যে দেশে সকলকে একপথে পরিচালিত করিবার চেষ্টা করা হয়, সে দেশ ক্রমশ ধর্মহীন হইয়া দাঁড়ায়। ভারতে কখনও এরূপ চেষ্টা হয় নাই। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে কখনও বিরোধ ছিল না, অথচ প্রত্যেক ধর্মই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ কার্য–সাধন করিয়া গিয়াছে— সেইজন্যই এখানে প্রকৃত ধর্মভাব এখনও জাগ্রত। সকল ধর্মে ভাল ভাল লোক, এই কারণেই সেইসব ধর্ম লোকের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিয়া থাকে, সুতরাং কোনও ধর্মকেই ঘৃণা করা উচিত নয়।
ভগবানের নামে এত গন্ডগোল, যুদ্ধ ও বাদানুবাদ কেন?‌ ভগবানের নামে যত রক্তপাত হইয়াছে, অন্য কোনও বিষয়ের জন্য এত রক্তপাত হয় নাই;‌ কারণ সাধারণ মানুষ ধর্মের মূল উৎসে যায় নাই। সকলেই পূর্বপুরুষগণের কতকগুলি আচার অনুমোদন করিয়াই সন্তুষ্ট ছিল। তাহারা চাহিত অপরেও তাই করুক। আত্মা অনুভূতি না করিয়া অথবা আত্মা বা ঈশ্বর দর্শন না করিয়া ‘‌ঈশ্বর আছেন’‌ বলিবার অধিকার কি মানুষের আছে?‌ যদি ঈশ্বর থাকেন, তঁাহাকে দর্শন করিতে হইবে;‌ যদি আত্মা বলিয়া কিছু থাকে, তাহা উপলব্ধি করিতে হইবে। যখন জীবনের বর্তমান অবস্থায় ভায়ানক অশান্তি উপস্থিত হয়, যখন নিজের জীবনের ওপরও আর মমতা থাকে না, যখন এইরূপ ‘‌তালি’‌ দেওয়ার ওপর ভয়ানক ঘৃণা উপস্থিত হয়, যখন মিথ্যা ও প্রবঞ্চনার ওপর ভয়ানক বিতৃষ্ণা জন্মায়, তখনই ধর্মের আরম্ভ।
উত্তরভূমিকা অথবা হিন্দুশব্দের সার্থকতা
আরএসএস ‌বিবেকানন্দকেও নিজেদের করে নিয়েছে। যেন তাদের ‘‌হিন্দুরাষ্ট্র’‌, স্বামীজিরই ভাবনা!‌ এমনই ভাব করে ‌বিবেকানন্দের নামে জয়ধ্বনি করছে তারা। তাদের নানান অপকর্ম, কুকর্মের দোহাই হিসেবে স্বামীজিকে উদ্ধৃত করা হচ্ছে। এটা একটা কৌশল। একটা চালাকি। সবাইকে মেরেধরে, জ্বালিয়ে–‌কুপিয়ে, ভেঙেচুরে যে হিন্দুবন্দনা হচ্ছে, তাতে যেন ‌বিবেকানন্দের অনুমোদন আছে, ভাবখানা এমনি!‌ 
দেশের হিন্দুত্ববাদীরা ‌বিবেকানন্দকে ‘‌হিন্দু জাগরণের’‌ নেতা বলে প্রচার করে। কিন্তু ‘‌হিন্দু’‌ শব্দটা ‌বিবেকানন্দের কাছে কি কোনও বিশেষ ধর্মীয় শব্দ ছিল?‌ তিনি বলেছেন, ‘‌যে ‘‌হিন্দু’‌ নামে পরিচয় দেওয়া এখন আমাদের প্রথা হইয়া দঁাড়াইয়াছে, তাহার কিন্তু আর কোনও সার্থকতা নাই;‌ কারণ ওই শব্দের অর্থ— ‘‌যাহারা সিন্ধুনদের পারে বাস করিত’‌। প্রাচীন পারসিকদের বিকৃত উচ্চারণে ‘‌সিন্ধু’‌–‌শব্দেই ‘‌হিন্দু’‌রূপে পরিণত হয়;‌ তঁাহারা সিন্ধুনদের অপরতীর–বাসী সকলকেই ‘‌হিন্দু’‌ বলিতেন। এইরূপেই ‘‌হিন্দু’‌ শব্দ আমাদের নিকট আসিয়াছে;‌ মুসলমান শাসনকাল হইতে আমরা ওই শব্দ নিজেদের ওপর প্রয়োগ করিতে আরম্ভ করিয়াছি। অবশ্য এই শব্দই ব্যবহারে কোনও ক্ষতি নাই, কিন্তু এখন ইহার সার্থকতা নাই।‌
গোহত্যা বিষয়ে স্বামীজি
এই ভারতেই এমন সময় ছিল, যখন গোমাংস ভোজন না করিলে কোনও ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণত্ব থাকিত না। বেদপাঠ করিলে দেখিতে পাইবে, কোনও বড় সন্ন্যাসী বা রাজা বা অন্য কোনও বড়লোক আসিলে ছাগ ও গোহত্যা করিয়া তঁাহাদিগকে ভোজন করানোর প্রথা ছিল। ক্রমশ‌ সকলে বুঝিল আমাদের জাতি প্রধানত‌ কৃষিজীবী, সুতরাং ভাল ভাল ষঁাড়গুলি হত্যা করিলে সমগ্র জাতি বিনষ্ট হইবে। এই কারণেই গোহত্যা–‌প্রথা রহিত করা হইল, গোহত্যা মহাপাতক বলিয়া পরিগনিত হইল। প্রাচীন শাস্ত্র পাঠে আমরা দেখিতে পাই, তখন হয়তো এমন আচার প্রচলিত ছিল, যেগুলিকে এখন আমরা বীভৎস বলিয়া মনে করি।
গোরক্ষিণী সভার প্রচারক এবং স্বামীজি
শ্রীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর ‘‌স্বামি–‌শিষ্য–‌সংবাদ’– এ জানিয়েছেন এক চমকপ্রদ ঘটনা। গোরক্ষিণী সভার প্রচারক এসে স্বামীজিকে একবার ধরেন কসাইয়ের হাত থেকে গরুদের রক্ষার জন্যে পিঁজরাপোলে টাকা দিতে। স্বামীজি প্রশ্ন করেন:‌ মধ্য–ভারতে এবার ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়েছে, নয় লক্ষ লোক অনশনে মারা গেছে। আপনাদের সভা এ ব্যাপারে কোনও সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কি?‌ ভদ্রলোক বললেন:‌ না। লোকের পাপে, কর্মফলে এই দুর্ভিক্ষ হয়েছে। ‘‌যেমন কর্ম তেমন ফল’‌ হয়েছে। একথা শুনে স্বামীজির মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। তিনি বললেন:‌ তা হলে বলতে পারি গরুরাও নিজের নিজের কর্মফলেই কসাইদের হাতে যাচ্ছে আর মরছে, আমাদের ওতে কিছু করবার দরকার নেই। সেই ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বললেন:‌ তা ঠিক, কিন্তু শাস্ত্রে বলে গরু আমাদের মাতা। স্বামীজি বললেন: হঁা, গরু আমাদের যে মা তা আমি বিলক্ষণ বুঝেছি–‌তা না হলে এমন সব কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করবেন?‌
স্বামীজির ঈপ্সিত ধর্ম
যদি কখনও একটি সার্বজনীন ধর্মের উদ্ভব হয়, তবে তাহা কখনও কোনও দেশ বা কালে সীমাবদ্ধ হইবে না, যে অসীম ভগবানের বিষয় ওই ধর্মে প্রচারিত হইবে, ওই ধর্মকে তাহারই মতো অসীম হইতে হইবে;‌ সেই ধর্মের সূর্য কৃষ্ণভক্ত, খ্রিস্টভক্ত, সাধু, অসাধু সকলের ওপর সমভাবে স্বীয় কিরণজাল বিস্তার করিবে;‌ সেই ধর্ম শুধু ব্রাহ্মণ্য বা বৌদ্ধ, খ্রিস্টিয়ান বা মুসলমান হইবে না, পরন্তু সকল ধর্মের সমষ্টি স্বরূপ হইবে, অথচ তাহাতে উন্নতির সীমাহীন অবকাশ থাকিবে;‌ স্বীয় উদারতাবশত‌ সেই ধর্ম অসংখ্য প্রসারিত হস্তে পৃথিবীর সকল নরনারীকে সাদরে আলিঙ্গন করিবে, পশুতুল্য অতি হীন বর্বর মানুষ হইতে শুরু করিয়া হৃদয় ও মস্তিষ্কের গুণরাশির জন্য যঁাহারা সমগ্র মানবজাতির ঊর্ধ্বে স্থান পাইয়াছেন, সমাজ, যঁাহাদিগকে সাধারণ মনুষ্য বলিতে সাহস না করিয়া সশ্রদ্ধ ভয়ে দণ্ডায়মান, সেই–সকল শ্রেষ্ঠ মানব পর্যন্ত সকলকেই স্বীয় অঙ্কে স্থান দিবে। সেই ধর্মের নীতিতে কাহারও প্রতি বিদ্বেষ বা উৎপীড়নের স্থান থাকিবে না;‌ উহাতে প্রত্যেক নরনারীর দেবস্বভাব স্বীকৃত হইবে এবং উহার সমগ্র শক্তি মনুষ্যজাতিকে দেবস্বভাব উপলব্ধি করিতে সহায়তা করিবার জন্যই সতত নিযুক্ত থাকিবে— এইরূপ ধর্ম উপস্থাপিত কর, সমগ্র জাতিই তোমার অনুবর্তী হইবে। 
উপসংহার অথবা আক্ষেপ 
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‌আধুনিক কালে ভারতবর্ষে ‌বিবেকানন্দই একটি মহৎ বাণী প্রচার করেছিলেন, সেটি কোনো আচারগত নয়। তিনি দেশের সকলকে ডেকে বলেছিলেন তোমাদের সকলেরই মধ্যে ব্রহ্মের শক্তি, দরিদ্রের মধ্যে দেবতা তোমাদের সেবা চান। বাংলাদেশের যুবকদের মধ্যে যেসব দুঃসাহসিক অধ্যাবসায়ের পরিচয় পাই তার মূলে আছে ‌বিবেকানন্দে‌র সেই বাণী যা মানুষের আত্মাকে ডেকেছে আঙ্গুলকে নয়।’‌
দেশের ‘‌জড়বাদীরা’‌ ‌বিবেকানন্দকে বোঝেননি। ছুঁৎমার্গী, সংস্কারাচ্ছন্ন, হিংসা, ভণ্ড, ধর্মীয় দালালেরা ‌বিবেকানন্দকে হস্তগত করতে সক্রিয় হয়েছে। এ বড়ই বেদনাদায়ক। আর বাঙালি?‌ এখনও কি আমরা ‘‌আত্মা’‌ আর ‘‌আঙুল’–এর তফাত করতে পেরেছি?‌‌‌

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top