(যাহা যায়, আর যাহা কিছু থাকে—তাই নিয়েই আস্ত জীবন। সেই জীবনের একটা জানলা খুলে দিলেন অতনু ঘোষ, তাঁর ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌তে। অভিনয়ে আবার বিস্মিত করলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মন ভরালেন প্রসেনজিৎ। সুদীপ্তা চক্রবর্তী, ইন্দ্রাণী হালদার, গার্গী রায়চৌধুরি উজ্জ্বল ছোট্ট পরিসরেও।)

অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: বাবার শুশ্রূষা করতে এসে, দেখা গেল, সেই ছেলেরই শুশ্রূষা দরকার। বাবা সুশোভন রায়চৌধুরি এককালের ব্রিলিয়ান্ট অধ্যাপক। এখন ডিমনেশিয়ায় আক্রান্ত। ভুলে যান বর্তমানের অনেক কিছু। নানান অসঙ্গতি তাঁর কথাবার্তায়, আচরণে। বাবাকে ঠিকঠাক চিকিৎসা করাতে শিকাগো থেকে কয়েকদিনের জন্যে কলকাতায় ফেরে সফল পুত্র আর্যনীল রায়চৌধুরি। বাবা, ছেলের কথাবর্তা, আচরণ কখনও সহজ ছন্দে এগোয়, কখনও বিষমভাবে তাল কেটে দেন বাবা। বাবাকে ঠিকঠাক ডাক্তার দেখানো, চোক আপ করানো, নানান পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় ছেলে। কিন্তু ছেলেকেই বাবা বলে বসেন এক অমোঘ সত্য—তুই ভাল নেই।
যে ছেলের জীবনে তথাকথিত সাফল্যের ঘাটতি নেই কোনও, চারপাশের লোকজন সমীহ করে চলে যাকে, যে ছেলে বাবার চিকিৎসার জন্যে ছুটে আসে কলকাতায়, সেই আর্যনীলকেই বাবা সুশোভন স্পষ্ট সিদ্ধান্তের মতো জানিয়ে দেন—তোর মন ভাল নেই।
এবার, কে কার শুশ্রূষা করবে?‌ ছেলে বাবার?‌ নাকি, বাবা ছেলের?‌ কার শুশ্রূষা দরকার?‌ এমন একটা অমোঘ গভীর প্রশ্ন এবং সত্য, ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌র প্রায় শুরুতেই স্পষ্ট করে দেন পরিচালক অতনু ঘোষ।
অতীত, না, বর্তমান?
চারপাশে যা ঘটে চলে অবিরল, সেটাই কি বর্তমান?‌ নাকি, যে অতীত এখনও জীবন্ত মনের মধ্যে, সেটাই বর্তমান?‌
বহুদিন পরে বাবার কাছে দেশে ফেরে ছেলে আর্যনীল। তার মুখ ভর্তি দাড়ি। বাবা সুশোভন রায়চৌধুরি ছেলের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলে ওঠেন, তোমার এই দাড়িটা জঘন্য লাগছে। তোমার মা দেখতে পেলে এক্ষুনি হাত-‌পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবে।
কথা শুনে মনে হয়, এর চেয়ে বর্তমান আর কিছু নেই। মনে হয়, এক্ষুনি পাশের ঘর থেকে আর্যনীলের মা বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু, হঠাৎ সুশোভনবাবুর মনে পড়ে যায়, ‘‌অপর্ণা তো চলেই গিয়েছে। কবে যেন গেল?‌ নাইনটি সেভেন?‌ নাইনটি নাইন?‌’‌
বর্তমান ভুলে যান। অতীত জেগে ওঠে। আবার বর্তমানে ফেরেন। এই ‘‌জ্বলন্ত’‌ বর্তমানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেই বোধহয় রাজি নন সূক্ষ্ম অনুভূতি সম্পন্ন সুশোভনবাবু। খবরের কাগজ খুললেই হিংসা, রক্ত, বিভাজন, ঘৃণা, ক্ষমতার দাপাদাপি। তাই খবরের কাগজ পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। প্রত্যাখ্যান করতে চান এই ভয়ঙ্কর বর্তমানকে। আবার শুশ্রূষাও চান। গভীর শুশ্রূষা। তাই ইঁটের টুকরো দিয়ে দেওয়ালে লিখে দেন উইলিয়ম গ্ল্যাডস্টোনের ভালবাসার স্বপ্নের কথা, ভালবাসার শক্তির কথা। ‘‌পাওয়ার অফ লাভ’‌ যখন ‘‌লাভ অফ পাওয়ার’‌কে সরিয়ে দেবে, তখন এই পৃথিবীতে শান্তির আশীর্বাদ নেমে আসবে।
দেওয়ালে এই কথা লেখেন, বুঝতে পারেন ছেলের ভাল না-‌থাকাকে, তবুও এলোমেলো হয়ে যায় তাঁর বর্তমান, ভুলে যান এক মিনিট আগের ঘটনা। আবার ছেলে যখন চেক-‌আপ করানোর জন্যে একদিন থাকার ব্যবস্থা করে নার্সিং হোমে, তখন কাতর শিশুর মতো জিজ্ঞাসা করেন, তুই আমাকে এখানে রেখে যাবি না তো?‌
এই প্রশ্নের সামনে শুধু আর্যনীল কেন, পৃথিবীর সমস্ত সন্তান যেন স্তব্ধ হয়ে আসে।
এভাবেই, খুব শান্ত, গভীরভাবে এগিয়ে যায় অতনু ঘোষের অন্তর্লীন ছবি ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌। বাবা, ছেলের গল্পে ক্রমে দেখতে পাই তিন নারীকে। একজন মল্লিকা, সুশোভনবাবুর হাউসকিপার—সুদীপ্তা চক্রবর্তী। অন্যজন, সাহানা, আর্যনীলের যৌবনের বন্ধু—ইন্দ্রাণী হালদার। তৃতীয় জনের কোনও নাম নেই ছবিতে। তিনি গার্গী রায়চৌধুরি। ছবির শেষ প্রান্তে সেই নারীর মুখোমুখি আর্যনীল। সেই নারী কি অন্য কোনও বাঁকের মুখে ঠেলে দিল আর্যনীলকে?‌
জীবনের আবহসঙ্গীত
বাবাকে যত্ন করে ঘরের বাইরে নিয়ে যায় আর্যনীল। ‘‌স্বাভাবিক’‌ করার চেষ্টা করে। কফি শপে নিয়ে যায়। সেখানে বসে, একটু দূরে, কাঁচের দেওয়ালের ওপাশে এক প্রাণোচ্ছল প্রেমিক, প্রেমিকাকে দেখতে পান সুশোভনবাবু। তখন তিনি ছেলে আর্যনীলকে বলেন, ‘‌জানিস, আমার মনে হয়, জীবনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইউ নিড ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।’‌ তারপর আমাদের বিহ্বল করে দিয়ে সুশোভন-‌রূপী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যেন পিয়ানোয় একটা সুর তোলেন। তারপর সুরেলা শব্দ দিয়ে গড়ে তোলেন ইউফোনি। আস্তে আস্তে একটা হালকা অর্কেস্ট্রেশন শোনা যায়। সব ভুলে তিনি সেই প্রেমের সুরকে তুলে আনেন কণ্ঠে। ছেলে আর্যনীল তথা প্রসেনজিৎ এই পরিস্থিতিতে ভেতরে ভেতরে বিব্রত। বাবার হাতটা ধরে ‘‌সংবিৎ’‌ ফেরায় আর্যনীল। এবং সত্যিই সংবিৎ ফেরে তাঁর। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি একটু ঝুঁকে‌ যেন মাটিতে হাত ছোঁয়ান। তারপর একটু হালকা হাসি ফুটিয়ে বলেন, ‘‌ভায়োলিনটা নামিয়ে রাখলাম।’
এই দৃশ্যের অভিঘাত সুদূরপ্রসারী হয়ে ওঠে। এবং আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না, হাতে ভায়োলিন না থাকলেও, জীবনের আবহসঙ্গীতে সামিল হওয়া যায়।
জীবনের আবহসঙ্গীতের এই অংশটুকুর জন্যেই সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রকে অজস্র অভিবাদন। কী অসাধারণ ইউফোনি তৈরি করলেন তিনি। সারা ছবি জুড়েই দেবজ্যোতির আবহ যোগ্য সঙ্গত করেছে পরিচালকের ভাবনাকে। নীরবতাও যে আবহের অংশ, ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌তে সেটাও প্রমাণ করলেন দেবজ্যোতি।‌‌
ময়ূরাক্ষী আছে
এই ছবিতে না দেখা গেল ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌ নদীকে, না দেখা গেল ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌ নামক নারীকে। তবুও ছবি জুড়েই আছে ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌।
ডিমনেশিয়ায় আক্রান্ত সুশোভনবাবু মাঝে মাঝেই খোঁজ করেন ময়ূরাক্ষীর। ছেলেকেও বলেন, একবার ডেকে আনতে পারিস ময়ূরাক্ষীকে? অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, পুরনো একটা চিঠি থেকে ঠিকানা পেয়ে খুঁজে খুঁজে ময়ূরাক্ষীর সন্ধানে যায় আর্যনীল। সেখানে গিয়ে হুইল চেয়ারে বসা এক নারীর মুখোমুখি আর্যনীল। কে এই নারী?‌ ময়ূরাক্ষী?‌ দর্শক যখন উৎকণ্ঠায়, যখন ময়ূরাক্ষীকে দর্শকও খুঁজে পেতে চাইছে, তখন সেই নারী জানায়, তার বন্ধু ময়ূরাক্ষী এখন বরোদায় থাকে। তারপর, সেই নারী আর্যনীলকে শুধু একটা কথাই জানায়, ময়ূরাক্ষী ভালবাসত আর্যনীলকে। কিন্তু সেই কথা তো কখনও জানা হয়নি আর্যনীলের।
এই হুইল চেয়ার বন্দী নারীর ভূমিকায় এই একটি দৃশ্যে তাঁর অভিনয়ে গভীর অভিঘাত তৈরি করেন গার্গী রায়চৌধুরি। তাঁকে ভুলে যাওয়া কঠিন। এই ছবির আরও দুই নারী সাহানা ও মল্লিকার ভূমিকায় ইন্দ্রাণী হালদার ও সুদীপ্তা চক্রবর্তী মুগ্ধ করেন আমাদের। আর্যনীলের বন্ধু হয়ে সাহানা তথা ইন্দ্রাণী সাবলীল উষ্ণতায় ভরিয়ে রাখে আর্যনীলকে। এই বন্ধুতায় নির্ভরতা আছে, কিন্তু ছমছমে কোনও যৌনতার নাম-‌গন্ধ নেই। আর, হাউসকিপার মল্লিকা হয়ে সুদীপ্তা চক্রবর্তী যেভাবে সামলান সুশোভনবাবুকে, তাও এক চমৎকার দৃষ্টান্ত—জীবনের ও অভিনয়ের।
অনন্য জুটি
বাংলা ছবিতে এক অনন্য, গভীর জুটিকে দর্শকের সামনে নিয়ে এল ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌। এই জুটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এই ছবিতে আবার বিস্ময় সৃষ্টি করলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কখনও অতীতে, কখনও বর্তমানে, কখনও যুক্তিতে, কখনও বিহ্বলতায়, কখনও গভীর ও কখনও শূন্য দৃষ্টিপাতে আমাদের কোন সুদূরে নিয়ে চলে যান সুশোভনরূপী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় সুশোভন রায়চৌধুরি। তাঁর এই অভিনয় আর একবার প্রণত করে আমাদের, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সামনে।
তাঁর এই অসাধারণ অভিনয়ের পাশে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের স্বাভাবিক অভিনয় অন্য এক মাত্রা যোগ করে ছবিতে। প্রসেনজিৎও জীবনের একটি সেরা অভিনয় উপহার দিলেন আমাদের। যে অভিনয় প্রায় না-‌অভিনয়ের কাছাকাছি। যা একজন অভিনেতার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলা ছবির ইতিহাসে ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌র এই জুটি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এর জন্যে পরিচালক অতনু ঘোষের কাছে আর একবার কৃতজ্ঞতা। এই ছবিতে তথাকথিত থ্রিলার নেই, অবৈধ প্রেম-‌টেমও নেই। শুধু জীবন আছে। সেই জীবনের ছবিকে সিনেমাটোগ্রাফিতেও সুন্দর ধরেছেন সৌমিক হালদার। এমন ছবিকে হৃদয় দিয়ে সমর্থন করার জন্যে প্রযোজক ফিরদৌসল হাসানকেও ধন্যবাদ।
জীবনের মহার্ঘ্য জানলা‌
জীবন নিজের পথেই চলে। ভাঙা-‌চোরা জীবন নিয়েও কেতাদুরস্ত ভঙ্গী বজায় রেখেই শিকাগো ফিরে যেতে হবে আর্যনীলকে। আর, কলকাতায় বসে, বাবা সুশোভন রায়চৌধুরি টেনে নেন রঙ-‌তুলি। খোকার স্কুলে তো লাগবে!‌ তাই মেঘের ছবি আঁকছেন তিনি। তারপর, মেঘের কোলে একটা জানলা এঁকে দেন তিনি। বলেন, এই জানলা দিয়ে খোকা আমাকে দেখতে পাবে।
ছেলে আর্যনীল তখন এরোপ্লেনের পেটে শিকাগোর পথে। সেখানেও এক জানলার ধারেই সে বসে। মেঘের জানলা আর উড়োজাহাজের জানলা দিয়ে একই রোদ এসে পড়ে মেঝেতে, এবং উড়োজাহাজের ভেতরের ছাদে।আমাদের জীবনে এমন একটা জানলা বড় প্রয়োজন। তা সে উড়োজাহাজের হোক বা মেঘের।ময়ূরাক্ষীতে এই জানলার খোঁজ দিলেন পরিচালক। এই জানলাটা বড় জরুরি। বড় মহার্ঘ্য। 

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top