(২০১৭–‌‌র বাংলা ছবির খতিয়ান দেখাচ্ছে, সবচেয়ে আলোচিত নায়ক এক প্রবীণ—সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও এক বালক—‘‌পোস্ত’‌র অর্ঘ্য।)

সম্রাট মুখোপাধ্যায়:
মধ্য পথই এখন মূল পথ। বাংলা সিনেমায় ‘‌মিডল রোড’‌–‌এরই এখন জয়জয়কার। সেটাই এখন মূল ধারা। ‘‌ফর্মুলা’‌ পুরোপুরি নিহত। দক্ষিণি ‘‌ফর্মুলা’র দিন বেশ কয়েক বছরই হল গত।  ২০১৭–‌র শেষে বোঝা গেল ‘‌মিডল রোড’‌ সিনেমাতেও কোনও বিশেষ ‘‌ফর্মুলা’‌র ছাঁচ অচল।
তার জোর বরং বৈচিত্র‌্যে। নানারকম ছবিতে। এটাই ২০১৭–‌র বাংলা ছবির জোর। বক্স ‌অফিসের আঙ্কিক হিসেব‌নিকেশের কেজো গণ্ডি পেরিয়ে।
আর তাই একদিকে ‘‌পোস্ত’‌ বা ‘‌বিসর্জন’‌–‌এর মতো পারিবারিক আবেগ–‌নাট্য যেমন সফল হয়,‌ ‘‌ইয়েতি অভিযান’‌ বা ‘‌আমাজন অভিযান’‌–‌এর মতো ব্যয়বহুল অভিযানধর্মী ছবি দেখতে ভিড় করেন ছোটরা–‌বড়রা, তেমনই আবার দর্শকের মনস্কতা পায় ‘‌টোপ’‌ বা ‘‌সমান্তরাল’‌ বা ‘‌চারদিকের গল্প’‌ বা ‘‌সহজপাঠের গপ্পো’ (‌মানসমুকুল পাল)‌–‌এ‌র মতো ভিন‌ধারার সাহসী ছবি। ‘‌মাছের ঝোল’‌–‌এ প্রবাস প্রত্যাগত ছেলে আর অসুস্থ মায়ের সম্পর্কের গল্প বলা হয় এক কৃষ্ণ–‌কৌতুকে। আর বছর–‌শেষে ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌–‌তে একইরকম প্রবাস ‌প্রত্যাগত ছেলে আর অসুস্থ বাবার গল্প বলা হয় গভীর অনুভবী ঢঙে। অপার ‌বেদনায়। দু‌টি ছবিই দর্শক–‌প্রশংসা পায়। এত রকমের ছবির আয়োজন আর তার প্রতি দর্শক আনুকূল্য—  এতেই বোধহয় বাংলা ছবির এই মুহূর্তের স্থিতিস্থাপকতার ব্যাপ্তিটা বোঝা যায়।
বাণিজ্যিক বিচারে এ ‌বছরের সফলতর ছবিগুলো হল ‘‌আমাজন অভিযান’‌ (‌পরিচালক:‌ ‌কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়)‌, বিসর্জন (‌কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়)‌, ‘‌পোস্ত’‌ (‌শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়)‌, ‘‌ইয়েতি অভিযান’‌ (‌সৃজিত মুখোপাধ্যায়)‌, ‘‌ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ’‌ (‌অঞ্জন দত্ত)‌, ‘‌মাছের ঝোল’‌ (‌প্রতিম ডি গুপ্ত)‌, ‘‌বিবাহ ডায়েরিজ’‌ (‌মৈনাক ভৌমিক)‌। বছরের একেবারে শেষ সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌রও (‌অতনু ঘোষ)‌ বক্স–‌অফিস রিপোর্ট ভাল। এছাড়াও ব্যবসা ভাল পেয়েছে ‘‌দুর্গা সহায়’‌ (‌অরিন্দম শীল)‌, ‘‌সমান্তরাল’‌ (‌পার্থ চক্রবর্তী)‌। বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেলে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবিও যে দর্শক কতটা হামলে পড়ে দেখেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ‘‌নন্দন’‌–‌এ সপ্তাহের পর সপ্তাহে ‘‌টোপ’‌ দেখতে দর্শকের ভিড় জমানো দেখে।
সন্দেহ নেই, ২০১৭–‌য় বাংলা ছবির সবচেয়ে আলোচিত নায়ক যিনি, তিনি এক অশীতিপর অভিনেতা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বছর‌ জুড়ে ছোট–‌বড়, সফল–‌অসফল অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু তিনটি ছবি সন্দেহাতীতভাবে তাঁকে এ বছরের শীর্ষ ‘‌নায়ক’‌–‌এর আসন দেবে। তিনটি তিন মাত্রার ছবি। সম্পূর্ণ তিন ধাঁচের তিনটি চরিত্র!‌ অথচ প্রতিটিতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যেন বিকল্পহীন!‌ ‘‌পোস্ত’‌–‌য় সংলাপবহুল, তেজিয়ান, লড়াকু এক বৃদ্ধ। যিনি নাতির দাবিতে ‌ছেলের সঙ্গে আদালতে লড়তেও পিছ‌পা নন। আবার ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌তে তিনিই এক ভগ্ন‌স্বাস্থ্য বাবা, স্বল্প সংলাপের ভেতরেও শুধুমাত্র দৃষ্টিপাত আর অভিব্যক্তিতে বাজিমাত করেন তিনি। আবার ‘‌চল কুন্তল’‌ ছবিটি সেভাবে বাণিজ্যিক সাফল্য না পেলেও, ততটা সমালোচক ধন্য না হলেও, শুধুমাত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এ ‌ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে দর্শক‌মনে কৌতূহল জাগায়।
আবার ‘‌পোস্ত’‌ সূত্রেই বছরের দ্বিতীয় চমক সাত বছরের অভিনেতা অর্ঘ্য বসুরায়। পর্দায় প্রথম মুখ দেখিয়েই চমকে দেয় অর্ঘ্য নিজ–‌অভিনয়গুণে। পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সন্দেহ নেই, নিজের সাম্রাজ্য অটুট রেখেছেন ‘‌ইয়েতি অভিযান’‌ আর ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌ সূত্রে। একটিতে ‘‌অ্যাডভেঞ্চারাস’‌ কাকাবাবু। অন্যটায় অন্তর্লীন বিষাদে মগ্ন আর্যনীল। অনায়াসে দু‌টি মাত্রাতেই বিচরণ ক‌রে তিনিও বুঝিয়েছেন তাঁর শক্তি অভিনয়ের বৈচিত্র‌্যই। ‘‌ওয়ান’‌ (‌বিরসা দাশগুপ্ত)‌–‌এও তিনি অন্যরকমের চরিত্রই বেছেছিলেন। খলনায়কের। দুর্ভাগ্য দক্ষিণী ফর্মুলার ছবি হওয়ায় এ ‌ছবিটি দর্শক আনুকূল্য পায়নি।
শৈবাল মিত্রর ‘‌চিত্রকর’‌ও এবছরের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের জীবনকে ছবির হৃদয়ে রেখেও এক সুদূর প্রসারী গল্প বলেছেন পরিচালক। অনবদ্য অভিনয় ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের। মন ছুঁয়ে গেছেন অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়ও।
ঋত্বিক চক্রবর্তীর হাফ ডজন ছবি মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ছ’‌টি চরিত্রই আলাদা‌ আলাদা রকমের। বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছে ‘‌বিবাহ ডায়েরিজ’‌ আর ‘‌মাছের ঝোল’‌। তার বাইরে ‘‌অসমাপ্ত’‌ (‌সুমন মুখোপাধ্যায়)‌, ‘‌ছায়া ও ছবি’‌ (‌কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়)‌, ‘‌চলচ্চিত্র সার্কাস’‌ (‌মৈনাক ভৌমিক)‌, ‘‌চিলেকোঠা’‌ (‌প্রেমাংশু রায়)‌ প্রতিটিতেই ঋত্বিক অনন্য। বোঝা যায় অন্য ধারার পরিচালকদের কাছে তিনিই এখন মূল ভরসা।
উল্লেখ করতে হবে ব্রাত্য বসুর কথাও। চরিত্রাভিনয়ের ভেতরে থেকেও তিনি হয়ে উঠেছেন মূল আকর্ষণ। প্রচলিত অর্থে নায়ক নন, অথচ নিজের কাঁধে ছবিকে টানছেন— ব্রাত্য ক্রমশ হয়ে উঠছেন পরিচালকদের ভরসাস্থল। ‘‌অসমাপ্ত’‌, ‘‌চিলেকোঠা’‌র পরে ‘‌বারান্দা’‌ও (‌রেশমি মিত্র)‌ সে কথাই প্রমাণ করেছে।
নায়িকাদের আগুপিছুটা অবশ্য এ ‌বছর অতটা পরিষ্কার নয়। বরং অনেকেই যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে ছবি মুক্তির সংখ্যায় এগিয়ে পাওলি দাম। ছ’‌টি মুক্তি পাওয়া ছবির মধ্যে সফল ‘‌মাছের ঝোল’‌। ‘‌দেবী’‌ (‌ঋক বসু)‌ ছবিটি অবশ্য তাঁকে ঘিরেই তৈরি। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ‘‌বারান্দা’‌য় দাপট দেখিয়েছেন। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ‘‌অসমাপ্ত’‌ আর ‘‌ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ’‌–‌এ। কোয়েল মল্লিকের এ ‌বছর ‘‌কামব্যাক’‌ ছবি ছিল ‘‌ককপিট’‌ আর ‘‌ছায়া ও ছবি’‌। দুটোতেই তাঁর চরিত্র প্রশংসা পেয়েছে‌। ‘‌ধনঞ্জয়’‌ আর ‘‌পোস্ত’‌য় মিমি চক্রবর্তী পরিণত অভিনয় করেছেন। একইভাবে সোহিনী সরকারও বৈচিত্র‌্য দেখিয়েছেন ‘‌বিবাহ ডায়েরিজ’‌, ‘‌দুর্গা সহায়’‌ আর ‘‌সব ভুতুড়ে’‌–‌র তিনরকম চরিত্রে। জয়া এহসান এক ‘‌বিসর্জন’‌–‌এর চোটেই কামাল করেছেন। ‘‌দুর্গা সহায়’‌, ‘‌চলচ্চিত্র সার্কাস’‌ আর ‘‌সমান্তরাল’‌–‌এ তনুশ্রী চক্রবর্তীও দাপট দেখিয়েছেন। গার্গী রায়চৌধুরি অভিনয় ভাবনায় একইরকম বৈচিত্র‌্য দেখিয়েছেন ‘‌মেঘনাদবধ রহস্য’‌ (‌অনীক দত্ত)‌, ‘‌চলচ্চিত্র সার্কাস’‌ আর ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌–‌তে। তিনটিই প্রচলিত ছকের বাইরে তিনটি জটিল চরিত্র। অনেকদিন পরে ‘‌মেহের আলি’ (‌অরিন্দম দে)‌‌ ছবিতে এক স্নিগ্ধ চরিত্রে বড় ভাল লেগেছে অমৃতা চট্টোপাধ্যায়কে।
তবে বছরের সেরা ‘‌সুইচ ওভার’‌টি দেখিয়েছেন দেব। একদা ‘‌ফর্মুলা’‌ ছবির সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল দেব, এখন পুরোপুরি ঝুঁকি নেওয়ায় বিশ্বাসী। তাই শুধু ‘‌আমাজন অভিযান’‌–‌এ নায়ক হিসেবে পাড়ি নয়, প্রযোজক হিসেবে বানান ‘‌ককপিট’‌ আর ‘‌চ্যাম্প’‌–‌এর মতো ব্যয়বহুল দুই প্রযোজনা। যা গল্পে–‌স্বাদে–‌সাহসে নতুন পথের দিশারি। দেব বুঝেছেন, বাংলা ছবির নতুন প্রজন্মের দর্শকও যে তৈরি। ‌‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top