আজ ক্রিসমাস ইভ। ক্যারল, ক্যান্ডেল, কেকে বাঙালি পাক্কা সাহেব। বিকাশ মুখোপাধ্যায়      
 

এইসব ঘোড়া আর ঘাস খাওয়ানোর ব্যাপারে আগেও একজন বলেছিল দাদা। আমি কিছু বুঝতে পারিনি। আবার আপনি সেই একই কথা বলছেন। একটু বুঝিয়ে বলুন তো। আমি তো বেকারি থেকে গাড়িতে মাল তুলে দোকানে দোকানে দিয়ে বেড়াই। এখানে ঘোড়ার কথা আসছে কোত্থেকে?‌’‌ সাহিন এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল।
আমি হেসে ফেলি। তার মানে আরও একজন মহীনের বদলে সাহিন বসিয়ে ওকে বলেছেন, ‘‌সাহিনের ঘোড়াগুলি কার্তিকের প্রান্তরে ঘাস খায়।’‌
এই কিছুদিন আগেই কার্তিকের প্রান্তর পেরোনো অগ্রহায়ণ মাসে ওর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ভোরবেলায় স্বাস্থ্য–হন্টন সেরে অনেকদিনই বগলে খবরের কাগজ নিয়ে ওর ভ্যান চালিয়ে যাওয়ার রাস্তায় প্রতিবাদহীন প্রেমিকের মতো প্রতীক্ষা করি। দূর থেকে ওর ‘‌এম.‌ এস.‌ বেকারি, প্রোঃ‌–মহঃ সাহিন’‌ দেখলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। না, সাহিন কোনও বেকারির মালিক নয়, তবে ভ্যানটা ওর নিজের। অস্পষ্ট ভোরে দু–তিনটে বেকারি থেকে মাল তুলে ও সাপ্লাইয়ে বেরোয়। আমার ও দু–চারজনের উদ্দেশ্য তাজা মাল নেওয়া, তাই ইতিউতি দঁাড়িয়ে থাকি। সেদিন একটু গায়ে–লাগা ঠান্ডা তাই রসিকতার সঙ্গে ঘোড়া ঘাসের কথা বলে ফেলে ওর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলাম। ওর নিষ্পাপ নীরব মুখের সামনে জীবনানন্দ দাশের পরিচয় দিয়ে প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলাম, আলোচ্য বিষয় কেক–এ।
‘‌কবে থেকে কেক আনবে আমাদের জন্যে?‌’‌ ‘‌সে তো জানেনই দাদা, প্রতিবারই তো কথা হয়। ডিসেম্বরের উনিশ তারিখ থেকে শুরু, তারপর কিছুদিন চলবে।’‌
হ্যঁা, ওর কাছ থেকে শুনেছি চব্বিশ তারিখ অবধি একনাগাড়ে কেক তৈরি হয়। তারপর মাঝ জানুয়ারি অবধি বিক্রি। বিভিন্ন দোকান থেকে এঁদের কেকের ক্রেতা অনেক, যঁাদের অনেকেই নামী কোম্পানির কেকও কেনেন। সাহিনই আমাকে গত বছর বলেছিল, কেক বিক্রিপর্ব শেষ হলে অন্যের হাতে ক’‌দিনের জন্যে ভ্যান ধরিয়ে দিয়ে বাড়ি যায়। বাড়িতে নিয়ে যায় কেক। লজ্জালজ্জা মুখ করে জানিয়েছিল, ওর বিবি ফ্রুট কেক খুব ভালবাসে।
সে কথা মনে করে এবার ওকে হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘‌কী সাহিন, গতবারে যে কেক বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলে তার একটুকরো রাখা আছে তো?‌’‌
‘‌কেন দাদা?‌’‌
‘‌আরে অনেক দামী জিনিস, যে কোনও দিন নিলামে উঠতে পারে।’‌
‘‌আপনার কিছু কিছু কথা আমি একবর্ণ বুঝতে পারি না দাদা’‌ বছর পঁয়ত্রিশের সাহিনের গলায় হতাশা।
অতএব তাকে বোঝানোর জন্যে বগলের থেকে ‘‌আজকাল’‌ বের করে মুখের সামনে মেলে ধরে তাকে পড়ে শোনাই। ‘‌প্রিন্স চার্লস ও ডায়ানার বিয়ের কেকের টুকরো নিলামে উঠতে চলেছে। ৬ ডিসেম্বর আমেরিকার নিলাম–ঘরে। ৮০০ ডলার দাম উঠতে পারে। বিশেষ ধরনের বাক্সবন্দী ফ্রুট কেকের টুকরো। ওপরে লেখা:‌ সিডি, বাকিংহাম প্যালেস, ২৯ জুলাই ১৯৮১। শুভেচ্ছা লেখা বিয়ের আসল উপহার কার্ডটিও রয়েছে।’‌
সাহিন প্রায় চোখ কপালে তুলে ফেলে, ‘‌এ তো বিশাল ব্যাপার!‌ ফ্রুট কেকের এমন হলে তা’‌লে অন্যান্য কেকের কী হবে?‌’‌ ও ওর লাইনে কথা বলে।
তখন আমি ওকে বিশেষত্ব, প্রেমট্রেম নিয়ে দু–‌চার কথা বলে কী করে ফ্রুট কেক এল, সে সম্পর্কে দু–চার কথা বলি। কেকের মধ্যে ফলের টুকরো দেওয়া প্রথম চালু করেন ল্যাঙ্কাশায়ারের অধিবাসিনী এক প্রেমিকা তঁার প্রেমিকের জন্যে। স্ট্রবেরি আর র‌্যাপসবেরির সঙ্গে তিনি মিশিয়েছিলেন হোয়াইট ক্রিম।
আমি আরও বলার মুডে ছিলাম কিন্তু সাহিনকে ছাড়তে হবে তাই বিরসবদনে কাগজ যথাস্থান করে সকালের বাজারের দিকে পা বাড়ালাম।
জানি না ল্যাঙ্কাশায়ারের রমণীর অনুপ্রেরণায় কি না, বো ব্যারাকের এক দোকানে ছানার কেক একদা যা দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হত, তাকে দোকানের মালিক বড়ুয়ারা বলতেন, ‘‌লাভ লেটার’‌, ‘‌লাভ লেটার’‌টি ছিল দামী ঘিয়ে রঙের কাগজ, যেটি আভেনে কেক ‘‌বেক’‌ করার সময় মুড়িয়ে দেওয়া হলেও সেটির কোনও ক্ষতি হত না। এখন অবশ্য ওই কাগজ, বিশেষ করে না পাওয়ার কারণে, ব্যবহার হয় না। এখন অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল চলে।
বো ব্যারাকের ছানার কেকে থাকে ছানা, ডিম, চিনি, কাজু, কিশমিশ, মোরব্বা। এই কেক কিন্তু দীর্ঘজীবী নয়। বড় জোর চার–পঁাচদিন। কিন্তু মিষ্টির দোকানের ছানার কেকের আয়ু তুলনায় বেশিদিন। সেখানে ডিম তো থাকেই না, কাজু কিশমিশ মোরব্বার ব্যাপারও নেই। সেখানে জঁাক দেওয়া ছানার সঙ্গে মেশানো হয় ছোট এলাচগুঁড়ো, মাপমতো চিনি। ছানার কেক কিন্তু বাংলার নয়, এটি ওড়িশার। যেখানে ছানাপোড়া বিখ্যাত। প্রসঙ্গত, বো ব্যারাকের ছানার কেকে এই ছানাপোড়ার ব্যবহার থাকে। 
ছানার কেক থেকে এবার আসল কেক–এ যাই। বিভিন্ন গন্ধের চকোলেট কেক, এগ হোয়াইটস অনলি, এগ হোয়াইটস অ্যান্ড এয়ক্‌স, এগ অ্যান্ড অয়েল, টর্টে, লো ফ্লাওয়ার কেক, আনবেকড কেক, ইয়েস্ট কেক, ব্ল্যাক ফরেস্ট, পাউন্ড কেক, ফোম অ্যান্ড স্পঞ্জ কেক, লেয়ার কেক, পোক কেক, তাছাড়া প্লেন, ফ্রুট, লেমন, চকোচিপস, মার্বেল, প্লাম। এই তালিকায় টিফিন কেক–কে ব্রাত্য রাখছি। কেননা তারা উৎসবে নেই, দৈনন্দিনে আছে। মাখন পাউরুটি, রুটি আলুভাজার মতো।
যা হোক, কেকের অষ্টোত্তর শতনামে ক্ষ্যামা দিয়ে এবার একটু ইতিহাস ঘঁাটব। তবে, আগে একবার ছোট বেকারিতে যাব, কেননা একবার বড়দের মহল্লায় ঢুকে পড়লে তাদের কথা হয়তো ভুলে যাব।
‘‌আসুন, আসুন।’‌ আন্তরিক অভ্যর্থনার পর চৌকাঠ পেরিয়ে বেকারির সীমানায় ঢুকে পড়লাম। ইস্ট মেশানো মিষ্টি গন্ধ। একটু যেন নেশা হয়ে যায়। একটু দূরে গনগনে চুল্লির ওপর তারজাল, তার ওপর লাইন করে শুয়ে আছে বিস্কুট। ছোটবেলার প্রিয় ‘‌এস বিস্কুট’‌। সুচিত্রা সেন যা খেতে ভালবাসতেন। এবার নিজের থেকেই নাক টানলাম। গন্ধটা ওখান থেকেই উজিয়ে আসছে। বেকারির একজন একটা স্টুল এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‌বসুন স্যর। বিস্কুট খাবেন?‌’‌ প্রথম প্রশ্নই এরকম, আমাকে বাচ্চা ভাবছে নাকি!‌ একটু ধাক্কা খাই। তাও পুরোপুরি লোভ সামলাতে পারি না। বলি, ‘‌আগে কাজের কথা হোক, তারপর দেখা যাবে।’‌ ম্যানেজার কিংবা মালিক হাসেন। জানালেন, ‘‌আমরা সারা বছর কেক তৈরি করি না। ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর, ব্যস। বড়দিন শুরু হল, আমাদের কাজ শেষ।’‌ ‘‌তারপর, তারপর বিক্রি?‌’‌ ‘‌আমরা তো বিক্রি করি না।’‌ শুনে আমি স্টুলে বসে বসেই হোঁচট খাই। ‘‌তাহলে সাতদিনের তৈরি কেক কী হয়?‌’‌ ‘‌যঁারা তৈরি করাতে আসেন, তঁারা নিয়ে যান। আমরা শুধু চার্জটা নিই।’‌
আমার কথায় তিনি বিশদ হন। হাতে একটা ছাপানো লিস্টিও ধরিয়ে দেন। যাতে পনেরো রকম জিনিসের নাম ও পরিমাণ লেখা আছে। এরপর বলেন, ‘‌ফর্দ মিলিয়ে জিনিস এনে এখানে বসে থাকবেন। আপনার সামনে কেক তৈরি হবে। গরম গরম সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। আমরা দুশো ষাট টাকা নেব। আপনি প্রায় বারো পাউন্ড কেক নিয়ে যাবেন। পরে এসে চার্জ দিয়ে নিয়ে যাবেন, এমন হবে না। আপনাকেই মাল কিনতে হবে, বসে থেকে বানানো দেখতে হবে।’‌ এমনটাই দস্তুর। আপনি বসে বসে দেখবেন কীভাবে এক কেজি করে আটা, মাখন, চিনি, মোরব্বা, পঁাচশো গ্রাম করে চেরি কাজুবাদাম কিশমিশ, মিক্স ফ্রুট দুশো গ্রাম, একশো গ্রাম করে ক্র‌্যাম ফ্রুটস, ঘি, ত্রিশটা ডিম, গুঁড়ো এলাচ জায়ফল জয়িত্রির সঙ্গে ভ্যানিলা এসেন্স রং পাল্টাতে পাল্টাতে মিশে 
যাচ্ছে। 
আপনার 
ইচ্ছে 
হলে 
আপনি এই 
কাজের সঙ্গে সামিল হতে পারেন। আমার সাজেশন, শুধু নয়নসুখ উপভোগ করুন। অবশ্য যদি বড় বড় দোকানের মিক্সিংয়ে সেলিব্রিটিদের হাজিরার ও যোগদানের ছবি কাগজে দেখে উত্তেজিত থাকেন তাহলে আলাদা কথা। 
বড় বড় কেকের দোকানে যাব, তার আগে কেকের ইতিহাসে এক চক্কর চোখ বুলিয়ে নিই। একদম হালে গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন, কেকের জন্ম মিশরে। তিন হাজার বছর আগেও মিশরে কেক ছিল। ফারাও তৃতীয় রামেশিস–এর পিরামিডের মধ্যে কবরে কেকের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই কেক ময়দা মধু মশলা মদ আর ফলের টুকরো দিয়ে তৈরি। এর সাতশো বছর পর গ্রিসে কেক বানানো শুরু হয়। সেখানে কেক–কে প্ল্যাকাস বলা হ‌ত। ময়দার সঙ্গে ডিম, দুধ, মধু, বাদাম ফেটিয়ে চুল্লি মোটামুটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এনে সেটা ‘‌বেক’‌ করা হত। এখানে একটা কথা, তখনকার গ্রিসে কিন্তু কেক কারও জন্মদিনে বা বড়দিনে কাটার জন্যে তৈরি হত না। চঁাদের দেবী আরটেমিসকে তুষ্ট করার জন্যে প্লাকাস বা কেক দেওয়া হত। মোমবাতির আলোতে ঘিরে সেই কেক নিবেদন করা হত। 
এখন যে জন্মদিন পালনের উৎসবে কেকের ওপর মোমবাতি দেওয়া হয় সেটি সম্ভবত এখান থেকেই এসেছে। বয়স অনুযায়ী মোমবাতির সংখ্যা এগুলো ইদানীংয়ের সংযোজন। বারবার কেক বলে এলাম বটে, কিন্তু তখনও এটি প্লাকাস। সে সময় ‘‌সাতুরা’‌ নামে একরকম চ্যাপ্টা কেক তৈরি হত। এরপর ফ্রান্স। যেখানে কেক তৈরি ও খাওয়ায় বিপ্লব শুরু হয়েছিল। আর ফ্রান্সই প্রথম ‘‌কেক’‌কে ‘‌কেক’‌ নামে ডাকে। কেক শব্দটির উৎপত্তি অবশ্য উত্তর ইউরোপের নোর্স ভাষায় ‘‌কাকা’‌ শব্দ থেকে। যা হোক, ফ্রান্স যখন কেক বলছে, ব্রিটেন আমেরিকায় তখন ‘‌গ্যাটিউ’‌ চলছে। আর ব্রিটেনে তখন কেক তথা গ্যাটিউ আর পাউরুটির তফাত সামান্য। একটা চ্যাপ্টা আরেকটা গোল। ব্রিটিশরাই আমাদের দেশে কেক নিয়ে আসে, তখন অবশ্য সে আর পাউরুটির তুতোভাই নয়। কেক তখন চিনির রস, ডিমের কুসুম মধু মাখন মদে অবগাহন করে ফলমূল, বাদাম, মোরব্বায় সজ্জিত, যার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাউরুটি। 
বিশ শতকের গোড়ার দিকে এক বড়দিনে কেক এদেশে এবং প্রথম কলকাতাতেই পদার্পণ করল। ইংরেজরা কলকাতার রইস বাবুদের এই জমাট অমৃতের টুকরো রসনায় পরখ করতে ডাকল। তঁারা তো একপায়ে খাড়া, কিন্তু ঝড় উঠল বাইরে। শোনা গেল, এর মধ্যে নিষিদ্ধ মাংস আছে। কেউ কেউ থমকালেন, কিন্তু ব্যাপারটা কলকে পেল না। তবে, একসময় এটিতে মাংস ছিল, সেটি আদ্যিকালে। 
খ্রিস্টমাস কেক হ‌ল খ্রিস্টমাস কেকের বিবর্তন। আগে ইউরোপে সারাদিন উপোস করে থাকার পর খ্রিস্টমাস ইভে এই পরিজ খাওয়া হত। এই উপোস করার ব্যাপারটা কিন্তু বিভিন্ন কারণে সব ধর্মেই চালু আছে। যার যার যথাবিধি পুজোআচ্চা করে প্রসাদ গ্রহণ। তো মাংস যব আর শুকনো ফল সিদ্ধ করে এই পরিজ তৈরি হত। অতঃপর মাংসের বদলে এল দুধ ডিম একত্রে পুডিং। পুডিংয়ে মাখা যব আর শুকনো ফল সেদ্ধ। কিছুকাল পর মনে হল ঠিক যেন জমছে না, তাই জমাট বঁাধার পর্ব শুরু। দেওয়া হল ইস্ট আর বেকিং পাউডার দিয়ে বেকিং করা। ব্যস, জমে ক্ষীর, সরি জমে কেক। সেই কেকই এদেশে নিয়ে এল ব্রিটিশরা।
যিশুর জন্মদিনে তো হ‌ল, জার্মানরা কিন্তু সাধারণের জন্মদিনে কেক কাটা ও খাওয়ার প্রচলন করল। প্রথম প্রথম এটি ছোট ছেলেমেয়েদের জন্যেই হত, কোনও একটি প্রধানত ক্লাবের বড় হলঘরে এলাকার সব কমবয়সিকে ডাকা হত। বড়রাও সঙ্গে থাকতেন। কেক কাটার সঙ্গে অন্যান্য খাওয়াদাওয়া হতই, তাছাড়া ছোটরা সারাদিনে উৎসবের মেজাজে আনন্দ ও খেলাধুলো করত। এটির নাম ছিল কিন্ডার ফেস্ট। তবে, তখন অন্য কোনও গান গাওয়া হয়ে থাকতে পারে। ‘‌হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’‌ গাওয়া হত না। কারণ, ১৮৯৩ সালে মিলড্রেড ও প্যাডি হিল দুই বোন এই গান লিখলেও জনপ্রিয় হতে ১৯৩৪ চলে আসে। যা এখন সারা বিশ্বে চালু। 
ব্রিটিশদের আনা কেকে নিষিদ্ধ(‌!‌)‌ মাংস আছে, এটা সাধারণ মানুষদের ভাবার আরও একটা কারণ ছিল। সেটা হল, ব্রিটিশদের আনার আগে থাকতেই জোড়াসঁাকোর ঠাকুরবাড়িতে পেস্ট্রি তৈরি করা হত। কেকের রেসিপির সঙ্গে যার অনেকাংশই মেলে। পেস্ট্রিতে ময়দা, মাখন, ঘি, দুধ, ডিম, লেবু, নুন, চিনির সঙ্গে চর্বি এবং তাড়ি মেশানো হত। কোনও কোনও পেস্ট্রির পুরে তঁারা মাছ–মাংস সেদ্ধ করেও দিতেন। ঠাকুরবাড়িতে এই রেসিপি দামাস্কাস থেকে কারও ভায়া হয়ে এসেছিল। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী সেটি তৈরি করেন। যার সুবাস, সুনাম ও দুর্নাম ঠাকুরবাড়ি ছাড়িয়ে রাস্তায় গিয়ে পৌঁছেছিল। ব্রিটিশরা কেক আনলেও প্রথমে এটা তারা নিজেদের বাড়িতে তৈরি করত। পরে তার মালমশলা সম্পর্কে সন্দেহ দূর হওয়ায় এবং স্থানীয় বড়লোকদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ায় কলকাতায় প্রথম কেকের দোকান খোলা হল। ১৯০৫–এ তখনকার হগ মার্কেটে ‘‌এস এক্স ডি‌ গামা’‌ কেকের দোকান খোলেন। তঁারা আজও আছেন। তার বাইশ বছর পর দুজন সুইস ভদ্রলোক ‘‌ফ্লুরিজ’‌ খুললেন। এখন অবশ্য এক সে এক দোকান হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকটি বিখ্যাত দোকান হল সালদানা, নাহুম, গ্রেট ইস্টার্ন বেকারি, ইমপিরিয়াল, কুকিজার, মল্লিক, ক্যাথলিন, বড়ুয়া এবং আর্মেনিয়ান কেকের দোকান। 
সকলেই ঐতিহ্যশালী, তবে নাহুমের আর একটু আলাদা ব্যাপার আছে। এটি ইহুদিদের প্রতিষ্ঠান। আর কে না জানে, সারা পৃথিবীতে কেক তৈরিতে ইহুদিদের নামই বেশি। যেমন নাহুম কিংবা ফ্লুরিজ তেমনই প্রত্যেক নামী দোকানের আলাদা আলাদা ‘‌সিগনেচার’‌ আছে। এখানে আমরা আর্মেনিয়ান কেকের কথা আলাদা করে শুনব। এঁরাও ক্রিসমাসে কেক করেন। তবে সে তারিখটি হল ৬ জানুয়ারি। এদিনই এঁরা ক্রিসমাস পালন করেন। আর্মেনিয়ান কেক খুবই মিষ্টি ও মশলাদার। আলাদা করে দারচিনি আর জায়ফল দেওয়া এই কেক স্বাদে অন্যদের চেয়ে একটু পৃথক। তবে একটা কথা, কলকাতায় খুব কমই আর্মেনিয়ান বাস করেন। তাই এঁরা কেক তৈরিও করেন কম। আস্বাদ নিতে গেলে এলাকায় যেতে হবে। এঁদের ছ’‌তারিখের কথা যখন এলই, তখন দুটো ‘‌কেক দিন’‌–এর কথা বলি। 
আন্তর্জাতিক কেক দিবস হল ২০ জুলাই, আর আমাদের কেক দিবস ২৬ নভেম্বর। ২০১১ সালে ‘‌ইন্টারন্যাশনাল কেক ডে’‌ পালন শুরু হয়েছিল। এমনিতে ২০ জুলাই দিনটি বিভিন্ন দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উদ্দেশ্যে চিহ্নিত। অনেক দেশে এদিন ছুটি দেওয়া হয়। এমন দিনে সৌহার্দ্যের স্মারক হিসেবে কেক যুক্ত হবে তাতে আর আশ্চর্য কী!‌ আর জাতীয় কেক দিবস ২৬ নভেম্বর, সেদিন ফান ডে বা মজার দিন। কেক ভক্ষণের থেকে বেশি মজা আর কীসে আছে!‌ আমেরিকাতেও এদিন ‘‌কেক ডে’‌। আমেরিকানরা এদিন সকাল, দুপুর, রাত্রি— সব খাওয়ার সময়েই কেক খান। 
কেক নিয়ে সেমিনার দেশে দেশে হয়। আমাদের কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয়। গত ছয় থেকে আট অক্টোবর প্রিন্সটন ক্লাবে ‘‌কেক অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি’‌ সেমিনার হল।
এখন কেক ‘‌ক্রিয়েট’‌ করা অর্থাৎ কেক মিক্সিং–এ আসি। প্রথাগতভাবে এটির একটি নির্দিষ্ট দিন আছে। ২৫ ডিসেম্বরের আগের চারটি রবিবারের শেষ রবিবারে এই মেলানো উৎসব হয়। এবার ২৬ নভেম্বর দিনটি পড়েছিল। সেদিন কলকাতার বেশ কয়েকটি জায়গায় এটি হয়েছিল। এই উৎসবে সংস্থার কর্মচারীরা ছাড়াও বিভিন্ন সেলিব্রিটি থেকে সাধারণ কচিকঁাচাদেরও ডাকা হয়। তঁারা বা তারা কিশমিশ, বাদাম, লাল চেরি, মোরব্বা, খোবানি, র‌্যাসবেরি ইত্যাদি আগে তৈরি মজানো মাখন ডিম ময়দা ও নানা ধরনের মদ সাধারণত রাম বা ওয়াইনের সঙ্গে মেশান বা মেশায়। হাতে থাকে গ্লাভস, মাথায় শেফের টুপি। এক রঙিন অনুষ্ঠান। চাহিদার কারণে নির্দিষ্ট দিন ছাড়াও অনেক জায়গায় এই সময়ের অন্যান্য দিনেও হয়। 
এক কথায়, নামী দোকান হোটেলে ‘‌কেকের কেকারব’‌ বড়দিনের এক মাসেরও আগে থাকতে শোনা যায়। ‘‌কেকের কেকারব’‌ শব্দবন্ধটি পরিচিতা এক সাংবাদিকের। খুব সুন্দর। তাই মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবলাম এমন কিছু নিদেনপক্ষে কেক নিয়ে একলাইন ছড়াও যদি এসে যায়। তাই কেক ভাবতেই আমার মিলশব্দ বেক, লেফ, মেক, শেক থেকে ব্লেকে ঠেকল। ব্রেকও ভাবলাম। সবই পরিচিত শব্দ। শুধু কবি উইলিয়ম ব্লেক জানি, কিন্তু ব্লেক বলতে কী বোঝায় জানি না। গুগল খুলে দেখি, আরে এ তো সোনার খনি!‌ ব্লেক হল দয়ালু, মজারু, স্নেহাস্পদ, যত্নবান, বোঝদার, মিষ্টি আর কেতাদুরস্ত সঙ্গে নাছোড় জেদি। কেকের সঙ্গে এর ছাড়া কার তুলনা হবে!‌ কেক কেক, বাঙালির ব্লেক।
‘‌টাচ উড’‌ এতক্ষণ একনাগাড়ে লিখতে লিখতে নস্টালজিয়া আমাকে আক্রমণ করল। সেই বছর পঞ্চাশেক আগের কথা। তখন খাস কলকাতাতেই গোনাগুনতি নামী দোকান। বাবা শৌখিন মানুষ ছিল। অনেক সময় হয়তো বা লাইন দিয়েই বড়ুয়া কিংবা ফ্লুরিজের কেক নিয়ে আসত। ২৫ ডিসেম্বর সকালে কেকের তলার গাঢ় ঘিয়ে রঙের কাগজটাকে পাতিয়ে নিয়ে কেকটা মা বড় বগিথালার ওপর বসিয়ে দিত। তখন আমরা এমনিতে মাটিতে বসে খেতাম। কিন্তু এদিন মায়ের মৃদু আপত্তিতেও বাবা আমাদের বড় পড়ার টেবিলে খবরের কাগজ পেতে তার ওপর বগিথালাটা রেখে কেক কাটত। পাশে রাখা বড় বড় প্লেটে সেই কেকের টুকরো রাখার পর মা আধখানা করে ডিম সেদ্ধ [‌তখন বাচ্চাদের একটা ডিম দেওয়া হত না]‌, পাকা কলা, আর জয়নগরের মোয়া দিত। বাবা, মা ও আমরা কলরব করে খেতাম। প্রায় প্রতিবারই সেজভাই গপু বলত, ‘‌মা কমলালেবুটা দিয়ে দিলে পারতে।’‌ ‘‌বিকেলে খাবি।’‌ মায়ের বঁাধা গতে উত্তর। আর আমি সবচেয়ে বড় হলেও মা বলতেন, ‘‌খোকন প্লেটটা সামলে।’‌ সেই সামলাতে সামলাতে পঁাচ দশক পার করে এলাম।
মা বাবা গপু কেউ আর নেই। অন্য ভায়েরা সপরিবার নিজের নিজের আস্তানায়। ২৫ ডিসেম্বর আমি নাতির সঙ্গে বসে সুগারের কথা ভুলে কেকে কামড় দিই।
আর একদিনের জন্যে চরম প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ফ্রান্সের সেই রাজকুমারী মারি আঁতোয়ানেৎ-এর সঙ্গে একমত হই, দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের প্রতি যিনি বলেছিলেন, ‘‌রুটি পাচ্ছে না তো কী, তারা কেক খাক’‌।‌‌‌‌ ■

 ছবি:কুমার রায়

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top