রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: শুক্রবার ভরদুপুরে রাজধানী দিল্লি–‌‌সহ গোটা দেশ তোলপাড় করে ছাড়লেন সর্বোচ্চ আদালতের ‘‌বিদ্রোহী’‌ চার প্রবীণ বিচারপতি। নজিরবিহীনভাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কার্যত বোমা ফাটালেন তাঁরা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাজকর্ম পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়ে চার প্রবীণ বিচারপতি বললেন, ‘‌দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন।’‌ তাঁদের যাবতীয় ক্ষোভ ছিল প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধে। তাঁরা বলেন, সুপ্রিম কোর্টের মামলা বণ্টনে প্রধান বিচারপতি আদালতের নিজস্ব নিয়ম ভেঙে নিজের মর্জি অনুযায়ী কাজ করছেন। এই বিষয়ে প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে তাঁদের লেখা একটি চিঠিও সাংবাদিকদের হাতে দেওয়া হয়। বিচারপতি জে চেলমেশ্বর তাঁর বাসভবনে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও তিন প্রবীণ বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, কুরিয়ান জোসেফ এবং এম বি লোকুর। বিচারপতি চেলমেশ্বরের কথায়, ‘‌আমরা চাই না, আজ থেকে ২০ বছর পরে লোকে বলুক, এই চার বিচারপতি নিজেদের অন্তরাত্মা জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন।’‌ বিশেষ সিবিআই আদালতের বিচারক বি এইচ লোয়ার মৃত্যুরহস্য মামলাটি নির্দিষ্ট একটি বেঞ্চে পাঠানো নিয়ে সরাসরি ক্ষোভপ্রকাশ করেন এই প্রবীণ বিচারপতিরা। বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতিগত বিষয়টি নিয়ে টালবাহানা ও আদালতের দৈনন্দিন কাজকর্মে অনিয়মের প্রসঙ্গও তোলেন তাঁরা।
একজন কর্মরত প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অন্য কর্মরত বিচারপতিদের এ হেন অভিযোগ, তা–‌‌ও সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে!‌ দেশের বিচার ব্যবস্থায় এমন কোনও ঘটনার নজির নেই। বিচারপতিদের সাংবাদিক বৈঠকের খবর সম্প্রচারিত হতেই কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদকে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ইতিমধ্যে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপাল। ‘‌‌সাংবাদিক সম্মেলন থেকে বিরত থাকা যেত,’‌ এই মন্তব্য করে বেণুগোপাল আশাপ্রকাশ করেন বিচারপতিরা কয়েকদিনের মধ্যেই নিজেদের মধ্যেকার বিরোধ মিটিয়ে নেবেন। আর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিচার বিভাগের কাজে সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। এদিকে বিকেলে দলের শীর্ষ নেতা ও বিশিষ্ট আইনজীবীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। দীর্ঘক্ষণ আলোচনা চলে। পরে সন্ধেয় সাংবাদিক সম্মেলন করে রাহুল বলেন, ‘‌নজিরবিহীনভাবে বিচারপতিরা যে সব মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন সেগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। শীর্ষ আদালতের উচ্চ পর্যায়ে এই তদন্ত করা হোক। সেইসঙ্গে বিশেষ সিবিআই আদালতের বিচারক বি এইচ লোয়ার মৃত্যুর বিষয়টিও তদন্ত করা উচিত।’‌ রাহুলের আগে কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা জানান, ‘‌বিচারপতিদের বিবাদে কংগ্রেস চিন্তিত। কারণ, গণতন্ত্রে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।’‌ রাহুলের বাড়িতে ওই বৈঠকে ছিলেন প্রবীণ নেতা ও আইনজীবী পি চিদম্বরম, সলমন খুরশিদ, মণীশ তিওয়ারি, কপিল সিবাল, বিবেক তনখাদের 
মতো নেতারা। ‌
তাঁর চার সহকর্মী যে আজ সাংবাদিক সম্মেলন করতে চলেছেন, জানতেন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র। তাঁর এজলাসে শুনানি চলছিল। দুপুর ১২টা বাজতেই বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় এবং এ কে খানউইলকারকে নিয়ে তিনি উঠে যান। জানিয়ে দেন, আবার দুপুর দুটোয় আদালত বসবে। সাংবাদিক সম্মেলনের পর চারদিকে আলোড়ন পড়ে যায়। দুটোয় প্রধান বিচারপতির এজলাসে তিলধারণের জায়গা ছিল না। উৎসুক আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ভিড় উপচে পড়ে। কিন্তু, সহকর্মীদের অভিযোগ নিয়ে কোনও বাক্যব্যয় না করে মামলার শুনানি শুরু করে দেয় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য জানার চেষ্টা শুরু করেন সাংবাদিকরা। কিন্তু, এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি তিনি। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জানানো হয়, প্রত্যেক বিচারপতিই সমান। ঠিকভাবেই মামলা বণ্টন করা হয়ে থাকে। সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির পর দ্বিতীয় প্রবীণতম বিচারপতি চেলমেশ্বর। তাঁর কিন্তু অভিযোগ, ‘শুনতে আশ্চর্য মনে হলেও সুপ্রিম কোর্টের কাজকর্ম মোটেও ঠিকঠাক চলছে না।’ ব্যাখ্যা চাওয়া হলে বললেন, ‘‌কোনও নিয়মের তোয়াক্কা না করে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলাগুলি জুনিয়র বিচারপতিদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’‌ আরও জানালেন, মাস দুয়েক আগে এই বিষয়টি লিখিতভাবে প্রধান বিচারপতির নজরে আনা হয়েছিল। ওই চার বিচারপতিই প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রধান বিচারপতি তাঁদের কথা শুনতে চাননি। চেলমেশ্বর বলেন, ‘আজ সকালে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে বিষয়গুলি জানানো হয়। এবং এই ধরনের ঘটনায় কীভাবে সুপ্রিম কোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা বলা হয়। কিন্তু, আমরা সব কিছু বললেও যাঁকে বলেছি তিনি বোঝেননি। সুতরাং সেক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ।’‌ চার বিচারপতি সমস্বরে অভিযোগ তোলেন, দেশের শীর্ষ আদালত যদি এইভাবে চলতে থাকে তাহলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। সাংবাদিকরা জানতে চান, তাঁরা কি প্রধান বিচারপতির ইমপিচমেন্ট চাইছেন?‌ উত্তরে চেলমেশ্বর বলেন, ‘‌এখন দেশই ঠিক করুক ইমপিচমেন্ট করা উচিত কিনা।’‌ এইভাবে সাংবাদিকদের কাছে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে নালিশ করা ঠিক কিনা সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিচারপতি রঞ্জন গগৈ বলেন, ‘‌আমরা তো কোনও নিয়ম ভাঙছি না। দেশবাসীর প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করছি।’‌ অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবীরা। সাংবাদিক বৈঠকের অব্যবহিত পরেই সিপিআই নেতা ডি রাজা বিচারপতি চেলমেশ্বরের বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করলে তা নিয়েও জলঘোলা হয়। সিপিএমের পক্ষ থেকে বর্তমান বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তদন্তের দাবি করা হয়েছে। 

 

বাঁ দিক থেকে বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ, চেলমেশ্বর, রঞ্জন গগৈ ও মদন লোকুর। দিল্লিতে, শুক্রবার। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top